| প্রচ্ছদ

আমাদের মা জননী-১৯

নারীকে চারিত্রিক অপবাদ দিলে আল্লাহ ভীষণ ক্ষুব্ধ হয়ে পড়েন-২

জুবাইর হাসান মোহাম্মদ জুলফিকার আলী
পঠিত হয়েছে ৪৯ বার। প্রকাশ: ২৬ জুন ২০১৯ ।

[গতকালের পর থেকে পড়তে হবে] 
এরপর, সুলমানদের ক্ষুদ্র একটি দল যারা ভুলক্রমে হযরত আয়েশা রা: এর ওপর মিথ্যা চারিত্রিক অপবাদ প্রচারে কোনো না কোনোরূপে অংশগ্রহণ করেছিলো, তাদের প্রতি আল্লাহ তায়ালা প্রচণ্ড তিরস্কার করে বলছেন ঃ
“(যখন) তোমরা এ (মিথ্যা)-কে নিজেদের মুখে মুখে প্রচার করছিলে, (তখন) নিজেদের মুখ দিয়ে এমন সব কথাগুলো বলে যাচ্ছিলে যে ব্যাপারে তোমাদের কোনো জ্ঞান ছিলো না, তোমরা একে তুচ্ছ বিষয় মনে করছিলে, কিন্তু তা ছিলো আল্লাহ তায়ালার কাছে একটি গুরুতর বিষয়। সূরা আন নূরঃ ১৫।”
অর্থাৎ (একটু ভেবে দেখো, তখন তোমরা কী মারাত্মক ভুলই না করছিলো,) যখন তোমাদের এক মুখ থেকে অন্য মুখে এ মিথ্যাকে বহন করে নিয়ে যাচ্ছিলে আর তোমরা নিজেদের মুখে সেইসব কথাই বলে বেড়াচ্ছিলে, যে সম্পর্কে তোমাদের কিছুই জানাছিলো না। তোমরা সেটাকে একটা সাধারণ কথা মনে করেছিলে। অথচ আল্লাহর কাছে তা ছিলো একটি মারাত্মক কথা! 
হযরত আয়েশা রা: কে নিয়ে মোনাফেকদের রটানো অপবাদে কিছু সরলমনা মুসলমানও শরীক হয়ে গিয়েছিলো। এই রটনার ঘটনাটি এক মুখ থেকে আরেক মুখে এবং আরেক মুখ থেকে অন্য মুখে, এভাবে খবরটি চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ছিলো। এটা করতে গিয়ে তারা এমন বিষয় মুখে উচ্চারণ করছিলো যার কোনো জ্ঞান তাদের ছিলো না। তারা এই অপবাদ সংক্রান্ত উড়ন্ত কথাগুলোকে হালকা মনে করেছিলো, কিন্তু আল্লাহর নিকট এটা গুরুতর বিষয়। কোনো মুসলিমের স্ত্রীর প্রতি এরূপ অপবাদ রচনা করা গুরুতর অপরাধ। আর এখানে ইনি হলেন আল্লাহর রাসূল সা: এর স্ত্রী। তাহলে তাঁর সম্পর্কে এমন অপবাদ রচনা করা কত বড় রকমের অপরাধ হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। ঐ সমস্ত লোকেরা এটাকে তুচ্ছ গন্য করেছিলো, কিন্তু আল্লাহর নিকট এটা ছিলো গুরুতর বিষয়। তারা ভেবেছিলো, “এসব বলাবলি করা এমন কিইবা গুরুতর বিষয়! এরকম কথা তো হাস্য কৌতুক হিসাবে বলা যেতেই পারে।” কিন্তু তাদের এই বলাবলি করাটা মারাত্মক গর্হিত কাজ ছিলো। যদি একজন সাধারণ মহিলার ক্ষেত্রেও এরূপ বদনাম রটানো হতো, তাহলেও আল্লাহর কাছে তা সামাণ্য বিষয় হতো না। আর এখানে যার ব্যাপারে বদনাম রটানো হচ্ছে তিনি তো নবীদের নেতা মুহাম্মাদ সা:-এর প্রিয়তমা স্ত্রীর ব্যাপারে করা হয়েছে। আল্লাহর কাছে এটা অতি জঘন্য ব্যাপার, যা তাঁকে ক্ষুব্ধ ও রাগান্বিত করেছে। কোনো নবীর স্ত্রীর ব্যাপারে এরূপ অপবাদ দিলে আল্লাহ তায়ালা এই অবস্থায় শাস্তি না দিয়ে পারতেন না। 
হযরত আয়েশা রা:-এর প্রতি চারিত্রিক অপবাদ দেয়া সংক্রান্ত যেসব ন্যাক্কারজনক কথা বলা হচ্ছিলো তা ঐ সমস্ত ক্ষুদ্র দলভূক্ত মুসলমানদের কানে আসার সাথে সাথে তাদের অন্তর ভয়ে থর থর করে কেঁপে উঠা উচিত ছিলো। তাদের সামনে এ সম্পর্কিত কোনো কথা উচ্চারিত হলে তাদের কণ্ঠ স্তব্ধ হয়ে যাওয়াটাই ছিলো বাঞ্ছনীয়। এ রটনার ঘটনাকে কোনো আলোচনার বিষয় বানানো অবশ্যই খারাপ মনে করা উচিত ছিলো। তাদের উচিত ছিলো মনকে আল্লাহর দিকে রুজু করে (সোজা করে) নবী সা: কে এসব কিছু দুর্বলতার উর্দ্ধে ভাবা। তাদের উচিত ছিলো যে, দোষারোপের নিকৃষ্টতম কথাগুলো উপেক্ষা করা। তাদের বোঝা উচিত ছিলো যে, এসব কথা পবিত্র পরিবেশকে বহু দূরে ছুঁড়ে ফেলে দিচ্ছিলো। তারা এসব শুভ উপলব্ধি থেকে দূরে থেকেছিলো বলেই আল্লাহ তায়ালা ঐ সকল বিভ্রান্ত হয়ে পড়া মুসলমানদের উদ্দেশ্যে ধমকের সাথে প্রশ্ন রেখে আদবের শিক্ষা দিয়ে বলেনঃ
“তোমরা যখন ব্যাপারটা শুনলে তখন সাথে সাথেই কেন বললে না, আমাদের এটা মোটেই সাজে না যে, আমরা এ ব্যাপারে কোনো কথা বলবো, (হে) আল্লাহ তুমি অনেক পবিত্র, অনেক মহান! সত্যিই (এ ছিলো) এক গুরুতর অপবাদ!- সূরা আন নূরঃ ১৬।”
অর্থাৎ যখন রটনার কথা, মিথ্যা গুজবের কথা তাদের কানে আসলো তখন সাথে সাথেই তাদের বলা উচিত ছিলো যে, “এ বিষয়ে আমাদের কোনো মন্তব্য করা উচিত নয়, এ বিষয়ে কোনো আলোচনা করাটাও ঠিক হবে না। পবিত্র তুমি হে আল্লাহ! অবশ্যই এ হচ্ছে এক ভয়ানক মিথ্যা অপবাদ।”
মোনাফেকদের ষড়যন্ত্রের ফাঁদে ভুলক্রমে জড়িয়ে পড়া ঐ সমস্ত সরলমনা মুসলমানদেরকে (ক্ষুদ্র দলভূক্ত) আল্লাহ তায়ালা তাঁর দয়া ও অনুগ্রহের মহিমায় ক্ষমা করেছিলেন। তবে ভবিষ্যতে তাদের দ্বারা এ ধরণের অবস্থার পুনরাবৃত্তি যেন না হয় সে বিষয়ে আল্লাহ সাবধান করে দিয়েছেন। এ ব্যাপারে তাদের উদ্দেশ্যে আল্লাহ তায়ালা উপদেশ প্রদান করে বলছেনঃ
“আল্লাহ তায়ালা তোমাদের উপদেশ দিচ্ছেন, তোমরা যদি মোমেন হও তাহলে কখনো এরূপ আচরণের পুনরাবৃত্তি করো না।- সূরা আন নূরঃ ১৭।”
অর্থাৎ আল্লাহ তোমাদেরকে নসিহত করেন, ভবিষ্যতে যেনো তোমরা এমন কাজ আর কখনো না করো যদি তোমরা ঈমানদার হয়ে থাকো। যারা প্রকৃত মোমেন হয়ে থাকবে, তারা এসব ঘৃণ্য কথাগুলো ছড়ানোর কাজ করতে পারবে না। এমন আচরণ করতে গেলে আল্লাহর ভয় তাদের নিয়ন্ত্রণ করবে। আল্লাহ তায়ালা তাদের প্রতি এই সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন যে, অতীতে যেসব ভুলভ্রান্তি হয়েছে, সেগুলো পুনরায় যাতে আর না হয়। যেহেতু তারা মোমেন, তাই সাবধানতা তাদের জন্যে একান্ত প্রয়োজন।
হযরত আয়েশা রা: এর প্রতি মিথ্যা অপবাদ প্রদান ঘটনাকে কেন্দ্র করে যেসব চক্রান্ত চলেছে এবং সেসবের সাথে পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে জড়িয়ে পড়ার কারণে মুসলমানদের মধ্যে থেকে যার যেসব ত্র“টি বিচ্যুতি হয়েছে সেগুলো আল্লাহ সাফ সাফ জানিয়ে দিচ্ছেন, যেন তারা এসব ত্র“টির ভয়াবহতা বুঝতে পারে এবং এসবের পুনরাবৃত্তি আর না ঘটায়। মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন ঃ
“আল্লাহ তায়ালা (তাঁর) আয়াতসমূহ স্পষ্ট করে তোমাদের সামনে বর্ণনা করেন এবং আল্লাহ তায়ালা হচ্ছেন বিজ্ঞ, কুশলী।-সূরা আন নূরঃ ১৮।”
অর্থাৎ “আল্লাহ তায়ালা তোমাদেরকে পরিষ্কার ভাষায় হেদায়েত দিচ্ছেন আর তিনি সর্বজ্ঞ ও বিজ্ঞানময়।” 
আল্লাহ জানেন মানুষের মন মানসিকতা এবং তাদের লক্ষ উদ্দেশ্য কি, তিনি জানেন তাদের অন্তরে কিসব কথা নিশিদিন আনাগোনা করে, তিনি জানেন মানুষের জীবনের গতি প্রকৃতি সম্পর্কে, তিনি জানেন মানুষের সমস্যাসমূহও। আর তিনিই সেগুলোর সমাধান দিয়ে থাকেন, তাদের জীবনের শৃঙ্খলা বিধান এবং তাদেরকে সঠিক পথে রাখার জন্যে তিনিই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেন। আর ভুলত্র“টি হয়ে গেলে, তাদের সংশোধনের ব্যবস্থাও তিনিই দিয়ে থাকেন।

[পরবর্তী অংশ আগামীকাল]

মন্তব্য