| প্রচ্ছদ

ট্রেন চলে ঝুঁকি নিয়ে

বগুড়াসহ উত্তরাঞ্চলের ৯ জেলার ৪১১টি রেল ব্রীজের  অর্ধেকই মেয়াদ উত্তীর্ণ

পুণ্ড্রকথা রিপোর্ট
পঠিত হয়েছে ৩৮৫ বার। প্রকাশ: ২৭ জুন ২০১৯ ।


রেলওয়ের লালমনিরহাট বিভাগের অধীন বগুড়াসহ উত্তরাঞ্চলের ৯ জেলায় বৃটিশ শাসনামলে নির্মিত ৪১১টি রেল ব্রীজের অর্ধেকই মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে গেছে। চুন আর সুরকির মিশ্রণযুক্ত ইটের গাঁথুনি দিয়ে নির্মিত ব্রীজগুলোর মেয়াদকাল সর্বোচ্চ ৬০ বছর ধরা হলেও এগুলোর বয়স অনেক আগেই প্রায় ১২০ বছর পেরিয়ে গেছে। 
খোদ রেলওয়ের কর্মকর্তারাই বলছেন, অনেক ব্রীজের গার্ডার দুর্বল হয়ে পড়েছে কিন্তু তার পরেও সেগুলো মেরামত করা হচ্ছে না। কেবলমাত্র যখন পিলারের নিচ থেকে মাটি সরে যাওয়ার মত ভয়াবহ ঘটনা জনগণের চোখে পড়ছে কেবল তখনই ব্রীজগুলো মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে ট্রেনের চালকরা বলছেন, ব্রীজের অবস্থা যেমনই হোক না কেন ট্রেনের নির্ধারিত গতি কমানোর কোন সুযোগ তাদের নেই। বরং কর্তৃপক্ষের নির্ধারণ করে দেওয়া গতিতেই তাদেরকে ট্রেন চালিয়ে নিতে হয়।
গত ২৩ জুন রাতে মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়ায় একটি ব্রীজ থেকে ট্রেন পড়ে গিয়ে ৪জন নিহত এবং বেশ কয়েকজন আহত হন। তার দু’দিনের মাথায় ২৫ জুন একনেক-এর সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রেলের ইঞ্জিন পুনর্বাসন সংক্রান্ত একটি প্রকল্পের অনুমোদন দিতে গিয়ে সারাদেশে নড়বড়ে সব রেল ব্রীজ চিহ্নিত করে দ্রুত সময়ের মধ্যে মেরামতের নির্দেশ দেন।
বগুড়াসহ এ অঞ্চলের ট্রেনগুলোর নিয়মিত যাত্রীরা বলছেন, একশ’ বছরের বেশি আগে বৃটিশ শাসনামলে নির্মিত ব্রীজগুলোর বেশিরভাগই যে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে তা বাইরে থেকে খোলা চোখে দেখলেই অনুমান করা যায়। ট্রেনগুলো বিশেষত দ্রুতগামী আন্তঃনগর ট্রেন যখন ছুটে চলে তখন ব্রীজগুলো যেন কাঁপতে থাকে। যে কোন সময় মারািত্মক দূর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। কিন্তু নির্ধারিত সময় আর নির্দিষ্ট কিছু গন্তব্যে যাতায়াতের জন্য ট্রেনের বিকল্প কোন যানবাহন না থাকায় বাধ্য হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়েই তাদের চলাচল করতে হচ্ছে।
রেলওয়ের হিসাব অনুযায়ী, উত্তরাঞ্চলে ১৮৯২ সালে রেললাইন স্থাপন শুরু হয়। পশ্চিমাঞ্চলের অধীন লালমনিরহাট বিভাগের আওতায় বগুড়ার সান্তাহার থেকে, গাইবান্ধা, রংপুর, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, লালমনিরহাট, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড় পর্যন্ত ৯ জেলায় ৫০০ দশমিক ৬১ কিলোমিটার রেলপথ রয়েছে। দীর্ঘ এই রেলপথে আগে আন্তঃনগর, মেইল ও লোকাল মিলে ৩২ জোড়া বা ৬৪টি ট্রেন চলাচল করতো। তবে ইঞ্জিন ও কোচ সংকটের কারণে ৯ জোড়া বা ১৮টি ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে যে ২৩ জোড়া বা ৪৬টি ট্রেন চলাচল করছে তার মধ্যে ৭ জোড়া বা ১৪টি আন্তঃনগর। বাকি ১৬ জোড়া বা ৩২টি ট্রেনের মধ্যে ১১ জোড়া মেইল এবং অন্য ৫ জোড়া বা ১০টি লোকাল। এসব ট্রেনে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ যাতায়াত করছেন। 
রেলওয়ে প্রকৌশল শাখার দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, লালমনিরহাট বিভাগে রেলের ছোট-বড় মিলিয়ে ৪১১টি ব্রীজ রয়েছে। চুনের সঙ্গে সুরকি মিশিয়ে ইট গেঁথে তার ওপর লোহার গার্ডার যুক্ত করে ব্রীজগুলো নির্মাণ করা হয়। তবে সাম্প্রতিককালের ব্রীজগুলো আরসিসি ঢালাই দিয়েই নির্মাণ করা হচ্ছে। রেলওয়ের বগুড়ার সহকারি নির্বাহী প্রকৌশলী আবু মুসা জানান, ইটের গাঁথুনি দিয়ে নির্মিত ব্রীজগুলোর মেয়াদ গড়ে ৬০ বছর। আর আরসিসি’র ব্রীজগুলোর মেয়াদ ১০০ বছর।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, শত বছরের প্রাচীন ব্রীজগুলো ট্রেন চলাচলের জন্য বেশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মাঝে মাঝেই ব্রীজগুলোর পিলার দেবে যাচ্ছে নয়তো গার্ডার দুর্বল হয়ে ট্রেন চলাচলে বিঘœ ঘটছে। সর্বশেষ গত বছরের ২২ সেপ্টেম্বর সকালে বগুড়ার সুখানপুকুর ও ভেলুরপাড়া রেলস্টেশনের মাঝে চকচকিয়া ব্রীজের একটি পিলার দেবে যায়। ব্রীজটি মেরামতে ২৪ ঘন্টারও বেশি সময় লেগে যায়। ওই সময় পর্যন্ত ট্রেন চলাচলও বন্ধ রাখতে হয়। একইভাবে এর আগে গাইবান্ধা জেলার মহিমাগঞ্জে বাঙালি নদীর ওপর এবং কুড়িগ্রামে অপর একটি রেলব্রীজ মেরামত ও সংস্কার করতে হয়েছে। এছাড়া গাইবান্ধার ভেড়ামারা এলাকায় অপর একটি ব্রীজ মেরামত জরুরী হয়ে পড়েছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গার্ডার দুর্বল হয়ে পড়েছে বগুড়া রেলওয়ে স্টেশনের পূর্ব দিকে করতোয়া নদীর ওপর শত বছর পূর্বে নির্মিত রেল ব্রীজেরও। সহকারি প্রকৌশলী আবু মুসা জানান, বগুড়ায় করতোয়া নদীর ওপর নির্মিত ব্রীজের গার্ডারগুলো শক্তিশালী করা প্রয়োজন। এরই মধ্যে কর্মকর্তারা ব্রীজটি পরিদর্শনও করেছেন।
 সোনাতলা-বগুড়া রুটে নিয়মিত ট্রেনে যাতায়াতকারী সোনাতলা সরকারি নাজির আকতার কলেজের কর্মচারী মোশারফ হোসেন মজনু জানান, ২৯ কিলোমিটার রেলপথে একাধিক রেলসেতু রয়েছে। এর মধ্যে বগুড়া স্টেশনের কাছাকাছি করতোয়া নদীর ওপর নির্মিত সেতুর ওপর যখন ট্রেন ওঠে তখন মনে হয় পুরো সেতুটি যেন কাঁপতে থাকে। প্রচ- ভয়ও লাগে তখন। তিনি বলেন, ‘সোনাতলা থেকে বগুড়ায় সড়কপথে যানবাহন থাকলেও সময় যেমন বেশি লাগে তেমনি ভাড়াও কয়েকগুণ বেশি গুণতে হয়। যে কারণে জীবনের ঝুঁকি সত্ত্বেও ট্রেনে চলাচল করি।’
বগুড়ার সান্তাহার থেকে দিনাজপুরগামী আন্তঃনগর দোলনচাঁপা এক্সপ্রেসের চালক আশরাফুল আলম জানান, ব্রীজের অবস্থা যাই হোক না কেন তাদের ট্রেনের গতি কমানোর কোন সুযোগ নেই। বুধবার দুপুরে বগুড়া রেলস্টেশনে দোলনচাঁপা এক্সপ্রেসের যাত্রাবিরতিকালে তিনি বলেন, ‘এই দোলনচাঁপা এক্সপ্রেস ট্রেনটি ঘন্টায় ৬৫ কিলোমিটার গতিতে চালানোর নির্দেশ রয়েছে। আমাদেরকে যে গতিসীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে তার কম বা বেশি করার কোন সুযোগ নেই।’ ঝুঁকিপূর্ণ সেতুর ওপর দিয়ে ট্রেন চালাতে ভয় করেন কি’না-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন,‘ভয় করলে তো আর ট্রেন চালানো যাবে না।’
রেলওয়ের লালমনিরহাট বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন জানান, তার বিভাগের অধীন ৪১১টি ব্রীজের অর্ধেকেরই মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে গেছে। তবে তাতে ভয়ের কিছু নেই। তিনি বলেন, ‘কিছু কিছু ব্রীজ সংস্কার, মেরামত আবার কোথাও কোথাও নতুন ব্রীজও নিমাণ করা হচ্ছে। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। এরই মধ্যে ৩টি ব্রীজের সংস্কার ও মেরামত শেষ হয়েছে। খুব শিগগিরই গাইবান্ধার ভেড়ামারায় ঝুঁকিপূর্ণ একটি ব্রীজ মেরামত শুরু করা হবে।’

 

মন্তব্য