| প্রচ্ছদ

'আরেক আয়লানের' কফিনের অপেক্ষায় মা

পুণ্ড্রকথা ডেস্ক
পঠিত হয়েছে ৬৩ বার। প্রকাশ: ৩০ জুন ২০১৯ ।

নদীর স্রোতের তোড়ে ভেসে যাওয়া স্বামী অস্কার মার্টিনেজ (২৫) ও ২৩ মাস বয়সী মেয়ে অ্যাঞ্জি ভ্যালেরিয়ার কফিনের জন্য অপেক্ষার প্রহর গুনছেন এল সালভাদরের সেই অসহায় নারী। মেক্সিকো সীমান্ত দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি দিতে গিয়ে রিও গ্রান্দ্রে নদীর স্রোতের তোড়ে ভেসে যাওয়া ভ্যালেরিয়া যেন ‘যুক্তরাষ্ট্রের আরেক আয়লান কুর্দি’। মৃত বাবার টি-শার্টের ভেতর থেকে হাত বের করে বাঁচার আকুতি যেন জানাচ্ছিলেন নিষ্পাপ এ শিশু। চোখের সামনে কোলের শিশুর মৃত্যু দেখার পর নিজ দেশে ফিরে গেছেন মা তানিয়া ভেনেসা অ্যাভালোস (২৩)।

মার্টিনেজ ও ভ্যালেরিয়ার করুণ এই মৃত্যু বিশ্ববিবেককে নাড়া দিয়েছে। সবার চোখের সামনে যেন ভেসে ওঠে সিরীয় শিশু আয়লান কুর্দির নিথর দেহ। ২০১৫ সালে গ্রিস উপকূলে এভাবেই ভেসে উঠেছিল সিরীয় শরণার্থী আয়লান (৩)। বিশ্বকে নাড়া দেয়া সেই ছবির মতো এল সালভাদরের শিশু ভ্যালেরিয়ার এই ছবিও যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্তে শরণার্থী সংকটের নির্মম বাস্তবতার বিষয়টি তুলে ধরছে।

রিও গ্রান্দ্রে নদীতে বাবা-মেয়ে ভেসে যাওয়ার সময় স্রোত এড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিলেন মা তানিয়া ভেনেসা অ্যাভালোস। স্বামী আর মেয়েকে সমাহিত করতে এল সালভাদরে ফিরে গেছেন তিনি। আজ বাবা-মেয়ের কফিন দেশে যাওয়ার কথা। সে দেশের সরকার জানিয়েছে, মেক্সিকো থেকে স্থলপথে প্রত্যর্পিত হওয়ার পর রোববার নাগাদ দেশে পৌঁছাবে বাবা-মেয়ের কফিন। সেই কফিন একবার ছুঁয়ে দেখার অপেক্ষায় রয়েছেন তানিয়া।

এল সালভাদরে পৌঁছে সংবাদমাধ্যমের সামনে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান শোকে কাতর তানিয়া। ওই সময়ে তার সঙ্গে ছিলেন দেশটির পররাষ্ট্র উপমন্ত্রী মাউরিসিও ক্যাবরেরা। তিনি কাগজপত্র ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের পথে বিপজ্জনকভাবে পাড়ি না দিতে দেশবাসীকে আহ্বান জানান। এল সালভাদরবাসীর উদ্দেশে তিনি বলেন, নিজের আর সন্তানের জীবন বিপন্ন করে তুলবেন না। পাচারকারী মানুষদের ওপর ভরসা করবেন না, যারা নিজের স্বার্থসিদ্ধির চেষ্টা করে আর নিজেদের করা প্রতিশ্রুতি পালনে প্রায়ই ব্যর্থ হয়।

দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাংশের সীমান্তসংলগ্ন রিও গ্রান্দ্রে নদী থেকে অভিবাসনেচ্ছু বাবা-মেয়ের করুণ পরিণতির ছবিটি সোমবার তোলা হয়। জায়গাটি মেক্সিকোর মাতামোরোস এবং টেক্সাসের ব্রাউনসভিল এলাকার মাঝামাঝি অবস্থিত, যা আন্তর্জাতিক একটি সেতুর প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে।

স্থানীয় পত্রিকাগুলো বলছে- অস্কার আলবার্তো মার্তিনেজ রমিরেজ (২৬) তার স্ত্রী তানিয়া ও সন্তানকে নিয়ে রোববার মাতামোরোস পৌঁছান। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কাছে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় প্রার্থনার কথা ছিল তাদের।

এই প্রক্রিয়ায় বেশ কিছুদিন সময় লাগবে ও মেক্সিকো সীমান্তের আশ্রয় শিবিরে ঠাঁই না পেয়ে হতাশ হয়ে যান রমিরেজ। থাকা-খাওয়ার খরচ জোগানোর সামর্থ্য না থাকায় স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে নদীপথে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমানোর পরিকল্পনা করেন তিনি। প্রথমে সন্তান ও পরে স্ত্রীকে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল তার। কিন্তু নদীর স্রোতে ভেসে যান বাবা-মেয়ে।

রমিরেজের মা জানান, তিনি অনেকবার না করেছিলেন ছেলেকে? কিন্তু পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হয়েছিল যে, ছেলের আর কোনো উপায়ও ছিল না? ছেলে ও নাতনির এই মর্মান্তিক মৃত্যুতে কান্না থামাতে পারছেন না এ বৃদ্ধা? এ ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেছেন মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট আন্দ্রেস ম্যানুয়েল লোপেজ ওবরাদর।

বহুদিন ধরেই মেক্সিকো ও মধ্য আমেরিকার কয়েকটি দেশ থেকে মানুষ যুক্তরাষ্ট্রে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিচ্ছেন। মেক্সিকোতে মাদককারবারিদের হানাহানি ও সরকারের অভিযান বেড়ে গেলে এই হার বৃদ্ধি পায়।

এর মধ্যে ট্রাম্প প্রশাসন শরণার্থী না নেয়ার সিদ্ধান্ত নিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। শরণার্থীদের দীর্ঘদিনের এই সমস্যাই যেন আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল এ ছবি।

মন্তব্য