| প্রচ্ছদ

সব মেশিন এক প্রতিষ্ঠান থেকে নিতে বাধ্য করা হচ্ছে

বগুড়া সদরে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বায়োমেট্রিক হাজিরা মেশিন কেনায় অনিয়মের অভিযোগ

পুণ্ড্রকথা রিপোর্ট
পঠিত হয়েছে ১০০ বার। প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০১৯ ।

বগুড়া সদরে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে বায়োমেট্রিক হাজিরা মেশিন কেনার ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের নির্দেশনা অনুযায়ী ডিজিটাল ওই যন্ত্রটি স্ব স্ব স্কুল কর্তৃপক্ষের কেনার কথা থাকলেও স্থানীয় উপজেলা পরিষদ এবং শিক্ষা অফিস তাতে বাধ সেধেছেন। বিদ্যালয়গুলোর ম্যানেজিং কমিটির সদস্য এবং শিক্ষকদের অভিযোগ, স্থানীয় উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও শিক্ষা অফিসের কর্মকর্তারা বিদ্যালয়গুলোর প্রধান শিক্ষকদের নির্ধারিত একটি প্রতিষ্ঠান থেকে বায়োমেট্রিক মেশিনগুলো বেশি দামে কিনতে বাধ্য করছেন।
অভিযোগ রয়েছে, নির্ধারিত প্রতিষ্ঠানের বাইরে যাতে অন্য কোন স্থান থেকে বায়োমেট্রিক মেশিন কেউ কিনতে না পারে সেজন্য সদর উপজেলা শিক্ষা অফিস থেকে বিদ্যালয়গুলোর প্রধানদের কাছে পছন্দের সেই প্রতিষ্ঠানের বিল ভাউচারও সরবরাহ করা হয়। এমনকি মেশিন সরবরাহের আগেই বিলের সঙ্গে সেই ভাউচারগুলোও জমা নেওয়া হয়। বিষয়টি নিয়ে বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটি ও শিক্ষকদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ থাকলেও উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে মুখ  খুলতে সাহস পাচ্ছেন না।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের কর্মকর্তারা জানান, নির্ধারিত সময়ে শিক্ষকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের পক্ষ থেকে সারাদেশে সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বায়োমেট্রিক হাজিরা মেশিন সংযোজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ডিজিটাল ওই যন্ত্রটি কেনার জন্য বিদ্যালয়গুলোর স্ব স্ব বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ও প্রধান শিক্ষকের নেতৃত্বে গঠিত ‘স্কুল লেভেল ইমপ্রুভমেন্ট প্ল্যান’ বা ‘স্লিপ কমিটি’র নামে সরকারিভাবে বাৎসরিক যে বরাদ্দ দেওয়া হয় তার পরিমাণও এবার বাড়ানো হয়েছে। 
সাধারণত শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ, খেলার সামগ্রী, স্কুলের পোষাক কেনা থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় কাজের জন্য প্রতিটি বিদ্যালয়ে গঠিত স্লিপ কমিটির নামে বিগত বছর পর্যন্ত ৪০ হাজার টাকা করে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এবার বিদ্যালয়গুলোতে বায়োমেট্রিক মেশিন কেনা বাধ্যতামূলক করার কারণে শিক্ষার্থী অনুপাতে বরাদ্দের পরিমাণ ৫০ হাজার টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১ লাখে উন্নীত করা হয়েছে।
নিয়ম অনুযায়ী, বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষা উপকরণসহ প্রয়োজনীয় সব কিছু কেনা-কাটার এখতিয়ার শুধুমাত্র ওই বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি, প্রধান শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষক প্রতিনিধির নেতৃত্বে গঠিত পাঁচ সদস্যের স্লিপ কমিটির। তবে বগুড়া সদর উপজেলার ১২১টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বায়োমেট্রিক হাজিরা মেশিন কেনার ক্ষেত্রে স্ব স্ব বিদ্যালয়ের স্লিপ কমিটির সেই ক্ষমতা স্থানীয় উপজেলা পরিষদ ও উপজেলা শিক্ষা অফিস কর্তৃপক্ষ কেড়ে নিয়েছেন। শুধু তাই নয়, সদর উপজেলা শিক্ষা অফিস থেকে বগুড়া শহরের খান্দার এলাকায় অবস্থিত ‘সফটোনিক আইটি’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের বিল ভাউচার সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়গুলোর প্রধান শিক্ষকদের কাছে পাঠানো হয়েছে। বিদ্যালয়ের নাম ও ঠিকানার জায়গা ফাঁকা রেখে বায়োমেট্রিক মেশিন, ক্যাবল, সফটওয়্যার সাপোটিং সরঞ্জামের সঙ্গে সার্ভিস চার্জ এবং ভ্যাট ও অন্যান্যকরসহ সেই প্রতিষ্ঠানের ভাউচারে প্রতটি যন্ত্রের মূল্য দেখানো হয়েছে ২১ হাজার টাকা। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সদর উপজেলার ১২১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে এখন পর্যন্ত শুধু পল্লীমঙ্গল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নামে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই বায়োমেট্রিক হাজিরা মেশিন সংযুক্ত করা হয়েছে। তবে বিল ভাউচার দাখিল করা হয়েছে সব বিদ্যালয়ের নামে। 
গত ২ জুলাই বগুড়া সদরের পল্লীমঙ্গল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা গেছে শিক্ষকদের কক্ষে ওই হাজিরা মেশিন যুক্ত করা হয়েছে। শিক্ষকরা জানান, বগুড়া সদর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আবু সুফিয়ান শফিক, উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুল জোব্বারসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা গত ৩০ জুন ওই মেশিন সংযোজন করেন। ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল মালেকের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল মেশিনটি তারা কোন প্রতিষ্ঠান থেকে কিনেছেন জবাবে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘না কোন প্রতিষ্ঠান থেকে আমরা কিনিনি। মেশিনটি উপজেলা শিক্ষা অফিস থেকে দেওয়া হয়েছে।’ একই কথা বলেন ওই বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষা এবং স্লিপ কমিটির সদস্য কল্পনা খাতুন। তিনি বলেন, ‘আমি কমিটির সদস্য হলেও উপজেলা শিক্ষা অফিস থেকে যখন মেশিন দেওয়া হয় তখন আমি ছিলাম না।’ 
পল্লীমঙ্গল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সদস্য আপেল মাহমুদ জানান, বিল ভাউচারে মেশিনের দাম ২১ হাজার টাকা দেখানো হলেও তারা বাজারে খোঁজ নিয়ে জেনেছেন মেশিনটির প্রকৃত দাম ১৬ হাজার টাকা। এদিকে বগুড়া সদর উপজেলাধীন আরও কয়েকটি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকরা অভিযোগ করেছেন তাদের বিদ্যালয়ে ওই মেশিন এখন পর্যন্ত সংযোজন করা না হলেও তার মূল্য বাবদ ‘সফটোনিক আইটি’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানটির নামে ২১ হাজার টাকার ভাউচার শিক্ষা অফিসে দাখিল করতে হয়েছে।
‘সফটোনিক আইটি’ নামে ওই প্রতিষ্ঠানটির সিইও সাখাওয়াত হোসেন জানান, বগুড়া সদর উপজেলার সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জন্য তাদের কাছ থেকেই বায়োমেট্রিক হাজিরা মেশিন কেনার ব্যাপারে উপজেলা শিক্ষা অফিসের সঙ্গে তাদের কথা হয়েছে। তিনি স্বীকার করেন তারা যে মেশিন সরবরাহ করছেন তার দাম ১৬ হাজার টাকা। তবে তার দাবি ওই মেশিনের সঙ্গে অনলাইন ডিভাইস সংযোগ এবং দীর্ঘ মেয়াদি সার্ভিসিং সুবিধা প্রদান করতে হবে বলেই পাঁচ হাজার টাকা বেশি রাখা হয়েছে।
বায়োমেট্রিক হাজিরা মেশিনগুলো দোকানের পরিবর্তে কেন উপজেলা শিক্ষা অফিস থেকে প্রধান শিক্ষকদের নিতে বাধ্য করা হচ্ছে-এমন অভিযোগের বিষয়ে বগুড়া সদর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুল জব্বার বলেন, এ অভিযোগ ঠিক নয়। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের লোকজন গিয়েই মেশিন স্কুলে সংযোজন করছে। তিনি বলেন, ‘আমরা শুধু ভাউচার নিচ্ছি।’ ১২১টি বিদ্যালয়ের মধ্যে শুধু একটিমাত্র প্রতিষ্ঠানে মেশিন সরবরাহ করা হরেও অন্যসবগুলোর বিল-ভাউচার জমা নেওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘৩০ জুনের মধ্যে হিসাব দাখিলের বাধ্যবাধকতার কারণেই এটি করতে হয়েছে।’
বায়োমেট্রিক হাজিরা মেশিন কেনার ক্ষেত্রে বিদ্যালয়গুলোতে হস্তক্ষেপ এবং পছন্দের একটি প্রতিষ্ঠান থেকে তা কিনতে বাধ্য করাণোর অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বগুড়া সদর উপজেলা চেয়ারম্যান আবু সুফিয়ান সফিক। তিনি বলেন, শুধু মেশিন কেনা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। বরং সেটির সঙ্গে উপজেলা শিক্ষা অফিসের অনলাইনে যোগাযোগ স্থাপন এবং পাঁচ বছর ধরে সার্ভিসিং সুবিধা যাতে নিশ্চিত হয় সেজন্যই একটি প্রতিষ্ঠানকে বেছে নেওয়া হয়েছে। এতে স্বচ্ছতার প্রশ্নটি হয়তো অমূলক হবে না কিন্তু আমরা যা করেছি সেটা সবার ভালোর জন্যই করেছি।’

 

মন্তব্য