| প্রচ্ছদ

আমাদের মা জননী-২৬

আয়েশা রা: সেই জ্ঞানশ্রেষ্ঠ-তাপসী-মহীয়সী রমনী

জুবাইর হাসান মোহাম্মদ জুলফিকার আলী
পঠিত হয়েছে ৪৯ বার


[গতকালের পর থেকে পড়তে হবে] 
হযরত আয়েশা (রা:) এর আল্লাহ প্রদত্ত বিশেষ প্রতিভা ও যোগ্যতা সর্বজন বিদিত। কোরআন ও সুন্নাহর ব্যাখ্যায়, মুসলিম আইন ও বিধানের বিশ্লেষণে তিনি ছিলেন অগ্রগণ্য। এসব ব্যাপারে তিনি যত কাছ থেকে রাসূল সা: কে দেখেছেন তা আর কারো পক্ষেই সম্ভব হয়নি। জ্ঞানের জগতে অন্য সকলের তুলনায় তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব ছিলো। শুধু নারীদের ওপরে নয় কিংবা শুধু অল্প সংখ্যক সাহাবিদের ওপর নয়; বরং হাতে গোনা দু’একজন ছাড়া সকল সাহাবি (রা:) দের ওপর তাঁর জ্ঞানের শ্রেষ্ঠত্ব ছিলো। রাসূল সা: এর সাহাবি হযরত আবু মুসা আশআরি রা: (মৃত্যু: ৫৪ হিজরি) বলেন: “আমাদের সাহাবিদের কাছে কোনো হাদিস অস্পষ্ট লাগলে, আমরা হযরত আয়েশা রা:-এর শরণাপন্ন হতাম। তাঁর কাছে অবশ্যই কোনো না কোনো ধারণা পাওয়া যেতো।”১ 
হযরত আয়েশা রা: এর ছাত্রত্ব গ্রহণ করেছেন শত শত সাহাবি রা: ও তাবেয়ীন রহ:। তাবেয়ী হযরত আতা ইবনে আবি রাবাহ রহ: (মৃত্যু ১১৪ হিজরি) বলেন: একজন ভালো ফকীহ এবং ভালো আলেম হিসাবে সবচেয়ে এগিয়ে ছিলেন হযরত আয়েশা রা:। তাঁর মতামত জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেতো সবচেয়ে বেশি।”২ 
তাবেয়ীদের মধ্যে সবচেয়ে অগ্রগণ্য ছিলেন ঈমাম যুহুরি রহ: (মৃত্যু: ১২৪ হিজরি)। তিনি বলেন: “সবচেয়ে ভালো জ্ঞান ছিলো আয়েশা রা: এর। বড় বড় সাহাবিগণ তাঁর কাছে জানতে চাইতেন।”৩ 
ঈমাম যুহুরি রহ: আরো বলেন যে, “যদি সকল মানুষের জ্ঞান এবং পবিত্র স্ত্রীগণের জ্ঞান একত্রিত করা হয়, তাহলে হযরত আয়েশা রা:-এর জ্ঞান সবচেয়ে বেশি হবে।”৪ 
হযরত উরওয়াহ ইবনে জুবায়ের রা: (মৃত্যু: ৯৪ হিজরি) বলেন: আমি কোরআন, ফারায়েজ, হালাল, ফিকহ, কবিতা, চিকিৎসা বংশ নামায় (সুদীর্ঘ বংশ তালিকা বর্ণনা করনে) আয়েশা রা: এর চেয়ে জ্ঞানী কাউকে দেখিনি।”৫ 
হযরত আয়েশা রা: এর মিষ্টভাষীতা, শুদ্ধভাষীতা, কথোপকথনের বচন, বক্তৃতা ইত্যাদি মিলে তিনি ছিলেন বিষ্ময়কর কথা শিল্পী। এসবকে সাহিত্য জগতের এক অনন্য স্বাক্ষর বলা যেতে পারে। কেননা কথা সৌন্দর্য হলো সাহিত্যের একটি মৌখিক রূপ। এই মৌখিক রূপের প্রকাশ পায় পরে আসা লিখিত মাধ্যমে, আর যাকে আমরা সাধারণ ভাষায় সাহিত্য বলে থাকি। যাহোক, হযরত আয়েশা (রা:) এর কথা শৈলী ও বিজ্ঞজনোচিত বক্তব্য সম্পর্কে হযরত মুসা ইবনে তালহা রা: বলেন, আমি আয়েশা সিদ্দীকা (রা:) এর চেয়ে অধিক শুদ্ধভাষী ও প্রাঞ্জলভাষী কাউকে দেখিনি।”৬ 
হযরত আহনাফ ইবনে কায়েস রহ: লিখেনঃ কোনো সৃষ্ট জীবেন এত সুন্দর ও মহত ভাষা আমি শুধু হযরত আয়েশা রা:-এর মুখেই শুনেছি।৭ 
রাসুল সা: এর বিশিষ্ট সাহাবি হযরত মুআবিয়া রা: বলেছেনঃ “আমি হযরত আয়েশা রা: এর চেয়ে বাগ্মী, বিশুদ্ধ ভাষী ও প্রতুৎপন্নমতী বক্তা দেখিনি।”৮ 
কোরআন নাযিলের পূর্বে আরবের সাংস্কৃতিতে সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় ছিলো তাদের কাব্য চর্চা। তাদের কাব্যের অনল বর্ষনে যুদ্ধ বেধে যেতো নয়তো শান্তির ঝর্ণা ধারা বয়ে যেতো। আরবের নারী পুরুষ নির্বিশেষে এ অফুরন্ত যাদুশক্তি ছিলো। সেই কাব্যজ্ঞান বিষয়েও হযরত আয়েশা রা: ছিলেন এক ক্ষনজন্মা নারীর প্রতীক। হাদিস গ্রন্থগুলোতে হযরত আয়েশা রা: এর জবানিতে অনেক কবিতার উল্লেখ আছে। হযরত আয়েশা রা:-এর কাব্য রুচিতে প্রীত হয়ে আরব কবিরা স্বরচিত কাব্যগুলো তাঁকে শোনাতেন।৯ 
হযরত আয়েশা রা: এর শিষ্যগণ বর্ণনা করেছেন যে, ইতিহাস ও সাহিত্য এবং বক্তৃতা ও কাব্য ইত্যাদি বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষেত্রে উম্মুল মোমেনীন আয়েশা রা: এর ভালো দখল ছিলো। তাবেয়ী হযরত হিশাম ইবনে উরওয়াহ রহ: (মৃত্যু: ১৪৬ হিজরি) বলেন: আমি কুরআন ফারায়েজ, হালাল-হারাম (অর্থাৎ ফিকহ) কাব্যিকতা, আরবের ইতিহাস ও বংশ বিদ্যায় হযরত আয়েশা রা:-এর চেয়ে অধিক জ্ঞাত আর কাউকে দেখিনি।”১০ 
তখনকার চিকিৎসা পদ্ধতি বলতে লতাপাতার গুনাগুণ এবং ছোট খাটো রোগের পরীক্ষিত ওষুধপথ্য বোঝায়। আজকের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যুগে এগুলো মূল্যহীন হলেও, ঐ সময়ও সমাজের কাছে এটাও একেবারে কম ছিলো না। এক ব্যক্তি হযরত আয়েশা রা: কে জিজ্ঞেস করেছিলো, আপনি চিকিৎসা বিদ্যায় এতজ্ঞান লাভ করলেন কিভাবে? আয়েশা রা: বলেন, “আসলে শেষ বয়সে রাসূল সা: প্রায়ই অসুস্থ থাকতেন। আরবের বিজ্ঞ হেকিম ও চিকিৎসকগণ আসতেন। তারা চিকিৎসা বিষয়ক অনেক কিছু বলতেন, আমি সেগুলো হৃদয়ে গেঁথে নিতাম।১১ 
আরবের বিভিন্ন সময়ের বিভিন্ন কথা, জাহেলি যুগের রীতি প্রথা, আন্ত:গোত্রীয় বংশ সূত্র ইত্যাদি জ্ঞানে হযরত আবু বকর রা: বড় পন্ডিত ছিলেন। তাঁরই কাছে তার সুযোগ্য কন্যা হযরত আয়েশা রা: এ গুলো শিখেছিলেন। জাহেলি আরবের যুদ্ধ বিগ্রহ সামাজিক জীবন বৈচিত্র্যের ইতিহাসও হযরত আয়েশা রা:-এর জবানিতে পাওয়া যায়। এসব প্রাচীন আরবের ইতিকথার পাশাপাশি ইসলামের ইতিহাসের তিনি ছিলেন প্রত্যক্ষ বর্ণনাকারী। কোরআন নাযিলের ইতিহাস থেকে শুরু করে রাসূল সা: এর পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের সকল ইতিহাস হযরত আয়েশা রা: বর্ণনা করেছেন। রাসূল সা: বিভিন্ন ইসলামী অনুশাসন কিভাবে পালন করতেন সেসবের বিবরণ যেমন তিনি দিয়েছেন, তেমনি রাসূলের যুগে সংঘটিত বিভিন্ন যুদ্ধের বর্ণনাও তিনি দিয়েছেন। 
[তথ্য সূত্র: ১.তিরমিযী, উদ্ধৃত: সীরাতে আয়েশা (রা:); পৃষ্ঠা-২৪৯। ২. মুস্তাদরাকে হাকেম, উদ্ধৃত: ঐ, পৃষ্ঠা- ঐ। ৩. তাবাকাতে ইবনে সাদ; উদ্ধৃত: ঐ, পৃষ্ঠা-২৫০। ৪. মুস্তাদরাকে হাকেম, উদ্ধৃত: ঐ, পৃষ্ঠা-২৫২। ৫. যুরকানি ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা-২২৭, হাকেম ও তাররানীর সূত্রে; উদ্ধৃত: ঐ, পৃষ্ঠা- ২৫১। ৬. তিরমিযী; উদ্ধৃতঃ মা’ আরেফুল কোরআন-মুফতি মুহম্মদ শফি রহ: (১৮৯৭-১৯৭৬ ইং), ষষ্ঠ খন্ড, পৃষ্ঠা- ৩৭০। ৭. মুস্তাদরাকে হাকেম; উদ্ধৃত সীরাতে আয়েশা রা:, পৃষ্ঠা-৩৫১। ৮. যুরকানী ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা: ২৬৭; তারবানী সূত্রে; উদ্ধৃ: সীরাতে আয়েশা রা:, পৃষ্ঠা-৩৫৩। ৯. সহীহ বোখারি: মানকিবু হাস্সান (রা:); উদ্ধৃতঃ সীরাতে আয়েশা রা:, পৃষ্ঠা-৩৬২। ১০. তাযকিরাতুল- হুফফাজ ইমাম যাহাবি,মৃত্যু: ৭৪৮ হিজরি; উদ্ধৃতঃ সীরাতে আয়েশা রা:, পৃষ্ঠা-৩৪৬। ১১.       মুস্তাদরাকে হাকেমঃ ষষ্ঠ খন্ড, পৃষ্ঠা-৬৭; উদ্ধৃতঃ ঐ, পৃষ্ঠা ৩৪৭। ] [পরবর্তী অংশ আগামীকাল]

মন্তব্য