| প্রচ্ছদ

কারাগার থেকে লেখা এরশাদের প্রেমপত্র

পুণ্ড্রকথা ডেস্ক
পঠিত হয়েছে ৯১ বার

সাবেক রাষ্ট্রপতি জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ৯০ বছর বয়সে রবিবার (১৪ জুলাই) মারা গেছেন।  ১৯৮৩ সালে সেনাপ্রধানের দায়িত্ব পালনকালে তিনি রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণ করেন এবং সামরিক শাসন জারির মাধ্যমে দেশ শাসন করেন।

দীর্ঘ নয় বছর ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার পর নব্বইয়ে গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন তিনি।

নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়েছে এরশাদের জীবন। রাষ্ট্রক্ষমতা, রাজনীতির বাইরেও তিনি আলোচিত ছিলেন তার প্রেম নিয়েও। বিভিন্ন সময়ে বেশ কয়েকজন নারীর নাম তার সাথে জড়িয়েছে।

১৯৯৮ সালের মাঝামাঝি সময়ে এরশাদের সাথে পরিচয় হয় বিদিশার। বিদিশা তখন দুই সন্তানের জননী। এরশাদ এবং বিদিশার প্রেম বিয়েতে গড়ায়। আবার ২০০৫ সালে নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে এই বিয়েও ভেঙে যায়।  

এরইমাঝে ২০০০ সালের ২০ নভেম্বর এরশাদ জেলে যান। রাষ্ট্র ক্ষমতায় তখন আওয়ামী লীগ। প্রায় পাঁচ মাস জেল খেটে এরশাদ মুক্ত হন ৯ এপ্রিল ২০০১ সালে।

এরশাদ জেলে বন্দী থাকলেও এই সময়টাতে বিদিশা প্রায় প্রতিদিন জেলখানার পাশের এক বাড়ির ছাদে গিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে এরশাদকে দেখতেন। সেখানে এরশাদ তার কাছে চিঠি লিখতেন লুকিয়ে। জেলখানার প্রহরীদের ফাঁকি দিয়ে অবৈধভাবে চিঠি পাঠাতেন বিদিশার কাছে।

এই চিঠিটি এরশাদ বিদিশাকে লিখেছিলেন ২০ জানুয়ারি ২০০১ সালে।

 

‘‘মাই লাভ,

আজ আমর জেলে দুই মাস পূর্ণ হলো। অথচ আমি এখানে মাত্র একদিনে জন্য এসেছিলাম। খালেদ জানিয়েছে, জমি বিক্রির বিষয়টা ভালোভাবেই অগ্রসর হচ্ছে। শেয়ার ট্রান্সফারটাও হয়ে গেছে। আমরা এখন সবকিছু ভালোভাবেই হবে বলে আশা করতে পারি

আজ সারাদিন আমি তোমার এবং জিওভান্নি’র কথা ভেবে উদ্বিগ্ন হচ্ছিলাম। আল্লাহকে ধন্যবাদ, তোমরা দু’জনেই ভালো আছো। তুমি অবশ্য কোরেনা ধরনের রিস্ক নেবে না, তা যা কিছুই হোক না কেন।

আমার রাজনীতির ভবিষ্যৎ কী হতে যাচ্ছে-তা আমি বুঝতে পারছি না। সকলকেই দেখছি পদ এবং অর্থের জন্য লালায়িত। কেউ আমার কথা চিন্তা করে না। কেউই পার্টি অফিসে যায় না। জাপা এখনো একটি বড় শক্তি, আমাদের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আমরা জনগণের মধ্যে প্রভাব বিস্তার করতে পারি। কিন্তু কে এসবের তোয়াক্কা করে! অথচ দেখ, বাইরে হচ্ছোটা কী। তরা সিগনেচার ক্যাম্পেইন করছে প্রেসিডিয়ামের পদগুলো পূরণের জন্য। একবার চিন্তা করে দেখ, কী নিষ্ঠুর ওরা!

শুক্রবার দিন তুমি তোমার মাকে কী বলবে? এখানে কি অন্য কোনো পথ আছে? তারচেয়ে তাকে সব সত্য বলে দেয়াই ভালো। তিনি জানেন, তুমি সিঙ্গাপুরে যাওনি, কাজেই এটা এখানেই ঘটেছে। তার জন্য এখন একমাত্র করণীয় হচ্ছে-পুরো বিষয়টাকে নিজের মধ্যেই রেখে দেয়া, কোনোভাবেই অন্যের কাছে প্রকাশ না করা।

যদি তুমি সিঙ্গাপুরে যাওয়া প্রয়োজন মনে করো, তাহলে অবশ্যই যাবে। পরবর্তী সময়ে তোমার যাওয়াটাও বেশ কষ্টকর হবে। আশা করি এয়ারপোর্টে এসবি তোমাকে আটকাবে না। আমি তখনো জেলেই থাকবো, তাই তারা মনে করতে পারে যে, তুমি কোনো মিশনে যাচ্ছ। কাজেই সাবধানে থেকে। তোমার যদি টিকেটের দরকার হয়, খালেদকে বলো, সে ব্যবস্থা করে দেবে। তুমি এই টাকাটা কিছুদিনের জন্য বাঁচিয়ে রাখতে পারো।

পুরনো বাসা থেকে মালমাল সরাতে তোমার একটি পিকআপ দরকার হবে। মনে রেখো, সবকটি এয়ারকুলার, বড় বড় ওয়াড্রোব, তোমার আয়রন গ্রিল, এমনকি ছোট ফ্যানগুলোও নিয়ে যাওয়া সহজ কাজ নয়। এ কাজে তুমি গফুরকে বলতে পারো। সে সব কিছু চমৎকারভাবে সামাল দেবে। তুমি আউয়াল কিংবা অন্যদেরও বলতে পারো সাহায্যের জন্য। খালেদকে বললে সে-ই সব ব্যবস্থা করে দেবে।

কাল আমার কনটেম্পট কেস। আমি এটা নিয়ে খুবই চিন্তিত, যদিও কেএম (খন্দকার মাহবুব) মোটেই চিন্তিত নয়। তারচেয়ে বরং সে ক্যাসেট (কেস) নিয়ে বেশি চিন্তিত। এখানে আমরা একটা পয়েন্ট দেখছি যে, দুই বিচারক কিন্তু একই ওপিনিয়ন দেয়নি। দুই বিচারকের বাক্যালাপ থেকে এটা পরিষ্কার যে, আমাকে সাজা দেওয়ার জন্য সিনিয়র জজকে সরকার সুস্পষ্ট চাপ দিয়েছে। প্রকৃতপক্ষে আমি তো মোটেই অপরাধী নই, হয়তো আল্লাহ আমাদের সাহায্য করবে।

তুমি আমাকে জানাওনি এবারের ঈদে তোমার বিক্রি কেমন হয়েছে। সেখান থেকে মুনাফাই বা হয়েছে কী পরিমাণ? অন্য কোনো কারণে নয়, এটা কেবল জানার জন্যই জানতে চাওয়া। প্রতি মাসেই তোমার কিছু নতুন নতুন সাপ্লাই দরকার। কমপক্ষে এক লাখ মূল্যের নতুন আইটেম যদি থাকে, তাহলে বিক্রিটা গতিশীল থাকবে।

আমি মাত্র শুনলাম, খালেদা জিয়া নাকি বলেছে-এই সরকার জনগণকে রক্ষা করতে পারছে না। আগামী কালকের হরকতালকেও সে সমর্থন নিয়েছে। আমি মনে করি, এটা আমাদের পক্ষেই যাবে। সরকার সমস্ত সেক্টরেই ব্যর্থ হয়েছে। এবং আমি নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করি যে, আগামী নির্বাচনে নৌকা চিরদিনের জন্যই ডুবে যাবে। আল্লাহ অহংকার পছন্দ করেন না। তাই হাসিনার অহংকারকে আল্লাহ ধ্বংস করে দেবেন। বেইমানদের শাস্তি অবশ্যই হবে।

‘আমি আমার অঙ্গীকার রাখি না’-বলে যে কথা তুমি আমার সম্পর্কে বলেছো, সেটা আমাকে খুবই দুঃখ দিয়েছে। আমি ওই মহিলাকে গ্রহণ করতে রাজি ছিলাম, কিন্তু সে-ই সবকিছু নষ্ট করে দিয়েছে।

এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি তোমার ক্ষেত্রে ঘটবে না। কারণ তুমি আমা জীবনটাকে পরিপূর্ণ করে দিয়েছো, যে জীবনের স্বপ্ন আমি দেখছিলাম অনেক দিন আগে থেকে। মানুষের জীবন মাত্র একটাই। অতীতে যে আমাকে আগুনে পুড়িয়েছে, তাকে ভুলে যেতে দাও।

লাভ ইউ, মিস ইউ, লং ফর ইউ। ইউ আর মাই ডার্লিং।

লাভ”

 

সূত্র: স্বৈরাচারের প্রেমপত্র, বিদিশা

মন্তব্য