| প্রচ্ছদ

সিলিন্ডারের খবর কেউ রাখে নাঃ বগুড়ায় সিএনজি চালিত অটোরিকশার ৯৯ শতাংশই ঝুঁকিপূর্ণ

মুজাহিদুল ইসলাম জাহিদ
পঠিত হয়েছে ৬৩০ বার। প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০১৮ । আপডেট: ০৯ অক্টোবর ২০১৮ ।

গ্যাস কিংবা হাওয়া ভরে রাখা হয় এমন সিলিন্ডারগুলোতে বগুড়ায় ঘন ঘন বিস্ফোরণ ঘটছে। এর মধ্যে যেসব বিস্ফোরণের ঘটনায় হতাহতের ঘটনা ঘটছে কেবল সেগুলোই মিডিয়ার নজরে আসছে। সর্বশেষ গত ৭ অক্টোবর জেলার শাহজানপুরে একটি ভলকানাইজিং দোকানের একটি সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়েছে। এতে এক ব্যক্তি নিহত এবং আরও ৩জন আহত হয়েছেন। এ খবর প্রতিটি মিডিয়ায় এসেছে। এর এক সপ্তাহ আগে গত ২৯ সেপ্টেম্বর শহরের সাবগ্রামে সিএনজি চালিত একটি অটোরিকশার গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়। তবে সেখানে কেউ হতাহত হয়নি বলে খবরটি কোন মিডিয়ায় আসেনি।
অনুসন্ধান বলছে, কমপ্রেসড্ (সংকুচিত) ন্যাচারাল গ্যাস বা সিএনজি যেসব সিলিন্ডারে ভরা হয় সেগুলোই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। প্রতিদিন উত্তলোন করা গ্যাসের চাপের মাত্রা কম-বেশি হওয়ার কারণেই সিলিন্ডারের কার্যক্ষমতা দ্রুত হ্রাস পায়।

বগুড়ায় শহর থেকে গ্রাম সব খানেই এখন সিএনজি চালিত অটোরিকশার চলাচল। দিন যতই যাচ্ছে এ ধরনের অটোরিকশার সংখ্যাও তত বাড়ছে। উপজেলা কিংবা ইউনিয়ন পর্যায়ে চলাচলরত যাত্রীবাহী বাসগুলোর আগে চলে কিংবা যেখানে বাস চলাচল করে না এমন গন্তব্যে দ্রুত পৌঁছানো যায় বলেই সিএনজি চালিত অটোরিকশার ওপর সাধারণ মানুষের নির্ভরশীলতা বেড়েছে। কিন্তু আমরা কি জানি ওই অটোরিকশার মধ্যে যে সিলিন্ডারটি রয়েছে সেটি আদৌ নিরাপদ কি’না?
বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটি) বগুড়া’র কর্মকর্তারা বলছেন, সিএনজি চালিত অটোরিকশায় যেসব সিলিন্ডার সংযোজন করা হয়ে থাকে সেগুলোর মেয়াদ বিশ বছর। কিন্তু গ্যাসের চাপ কম-বেশি হওয়ার কারণে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেগুলোর কার্যক্ষমতা দ্রুত কমে আসে। এ কারণে পাঁচ বছর পর পর রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল) বা তার অনুমোদিত সিএনজি সিলিন্ডার টেস্টিং প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সিলিন্ডারগুলো পরীক্ষা করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ওই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেই কেবল ফিটনেস সনদ মিলবে। এজন্য প্রতি বছর ফিটনেস সনদ নেওয়ার সময় সিলিন্ডার টেস্ট রিপোর্ট দেখানোর নিয়মও রয়েছে।
বগুড়ায় ২০০৫ পাইপ লাইনে গ্যাস সরবরাহ দেওয়া হয়। ২০০৬ সালে সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলো স্থাপন করা হয়। আর পরের বছর থেকে বগুড়ায় সিএনজি চালিত অটোরিকশা চলাচল শুরু হয়। স্থানীয় বিআরটিএ কার্যালয়ের হিসাব অনুযায়ী ২০০৭ সাল থেকে গেল ২০১৬ সাল পর্যন্ত ১১ বছরে জেলায় ৫ হাজার ৪৫৮টি সিএনজি চালিত অটোরিকশার রেজিস্ট্রেশন দেওয়া হয়েছে। তবে মালিক সমিতি এবং শ্রমিক ইউনিয়নের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী রেজিস্ট্রেশন ছাড়াও আরও প্রায় পনের হাজার সিএনজি চালিত অটোরিকশা চলাচল করছে।
বিআরটি’এ কর্মকর্তারা বলছেন, রেজিস্ট্রেশন করা অটোররিকশার ৯৯ শতাংশেরই ফিটনেস সনদ নেই। স্বাভাবিকভাবে এসব অটোরিকশার গ্যাস সিলিন্ডারগুলোরও কোন পরীক্ষা করা হয়নি। ২০০৭ সালে যে ২ হাজার অটোরিকশাকে রেজিস্ট্রেশন দেওয়া হয়েছে তাদের ২০১২ সালের মধ্যে সিলিন্ডার পরীক্ষা করানোর কথা থাকলেও গেল ১০ বছরে তা করা হয়নি। একইভাবে ২০১০ এবং ২০১৩ সালে রেজিস্ট্রেশন নেওয়া আরও ২ হাজার ২০০ অটোরিকশার গ্যাস সিলিন্ডারগুলো আজ পর্যন্ত পরীক্ষা করানো হয়নি। বগুড়ায় আরপিজিসিএল অনুমোদিত গ্যাস সিলিন্ডার টেস্টিং প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা জানিয়েছেন, রেজিস্ট্রেশনবিহীন অটোরিকশারগুলোও একই অবস্থা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সিএনজি চালিত অটোরিকশার একটি গ্যাস সিলিন্ডার পরীক্ষায় মাত্র ১হাজার ৫০০ থেকে দুই হাজার টাকা ব্যয় হয়। কিন্তু পাঁচ বছর পর পর সামান্য ওই টাকা খরচেও মালিকদের অনীহা। যে কারণে তারা সিলিন্ডার পরীক্ষা করা থেকে বিরত থাকেন। যে কারণে  বগুড়ায় গেল ৭/৮ বছরে অনেকগুলো সিলিন্ডার টেস্টিং প্রতিষ্ঠান খোলা হলেও কোনটিই তেমন গ্রাহক পায়নি। ফলে তারা ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে। তবে গেল ২/৩ বছরে এ জেলায় আবার নতুন করে তিনটি সিএনজি গ্যাস সিলিন্ডার টেস্টিং সেন্টার চালু করা হয়েছে। কিন্তু তারাও গ্রাহক পাচ্ছেন না। ‘সোনালী সিলিন্ডার রি-টেস্ট’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী নজরুল ইসলাম জানান, বগুড়ায় বৈধ এবং অবৈধ মিলে প্রায় ২০ হাজার সিএনজি চালিত অটোরিকশা রয়েছে। প্রতি পাঁচ বছর পর পর গ্যাস সিলিন্ডারগুলো পরীক্ষা করা বাধ্যতামূলক হলেও অটোরিকশা মালিকরা তা করাতে চায় না। তিনি বলেন, ‘বগুড়ায় দেড় বছর আগে আমরা ব্যবসা শুরু করেছি। কিন্তু এ পর্যন্ত মাত্র ৫০টি অটোরিকশার গ্যাস সিলিন্ডার টেস্ট করা হয়েছে।’
বগুড়া-তিনমাথা-কাহালু সড়কে চলাচলকারী সিএনজি চালিত অটোরিকশা চালক পলাশ জানান, তার অটোরিকশার সিলিন্ডারের বয়স পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও তা পরীক্ষা করানো হয়নি। তার মালিক মনে করেন সিলিন্ডার পরীক্ষা করানো একদিকে যেমন সময় সাপেক্ষ তেমনি তাতে পয়সাও খরচ হয়। ত্রুটিপূর্ণ সিলিন্ডারের কারণে তার নিজেরসহ যাত্রীদের জীবন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে- এমনটা জানালে পলাশ বলেন, ‘শোনেন এখন তো রাস্তায় চলাচল করাই ঝুঁকিপূর্ণ। ভাগ্যে যা লেখা আছে তাই হবে।’
মালিকদের অনীহার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে বগুড়া জেলা সিএনজি চালিত অটোটেম্পু, অটোরিকশা ও যানবাহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আলহাজ শেখ বলেন, ‘এটা আসলে মালিকদের এক ধরনের অজ্ঞতা। তবে এটা অবশ্যই করা দরকার বলে আমাদের সমিতি মনে করে।’ তিনি এ ব্যাপারে সিএনজি চালিত অটোরিকশা মালিকদের সচেতন করে তুলতে উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়ে বলেন, ‘আমরা খুব শিগগিরই মালিকদের ডেকে যাদের অটোরিকশার গ্যাস সিলিন্ডারের বয়স পাঁচ বছর হয়ে গেছে তাদেরকে পরীক্ষা করানোর জন্য সমিতির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্দেশনা দেব।’
বগুড়ায় বিআরটিএ’র মোটর যান পরিদর্শক ফয়েজ আহম্মেদ জানান, এ জেলায় সিএনজি চালিত যত অটোরিকশার রেজিস্ট্রেশন দেওয়া হয়েছে তার মাত্র ১ শতাংশের ফিটনেস রয়েছে। যেহেতু গ্যাস সিলিন্ডার পরীক্ষার সনদ ছাড়া ফিটনেস সনদ দেওয়ার বিধান নেই, তাই বলা যায় যে যাদের ফিটনেস সনদ নেই তাদের গ্যাস সিলিন্ডারেরও কোন মান পরীক্ষা করা হয়নি। তিনি বলেন, ‘অটোরিকশার গ্যাস সিলিন্ডারগুলো নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পরীক্ষা করানোর জন্য আমরা মালিক সমিতিকে একাধিকবার অনুরোধ করেছি। কিন্তু দুঃখজনক হলেও তাদের তেমন সাড়া পাওয়া যায়নি। তবে আমরা আবারও তাদেরকে সিলিন্ডার পরীক্ষা করানোর জন্য তাগাদা দেব।’

মন্তব্য