| প্রচ্ছদ

স্মরণঃ আলোকিত মানুষ গড়ার মহান কারিগর তাজমিলুর রহমান

মোহন আখন্দ
পঠিত হয়েছে ২৮৩ বার। প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০১৮ । আপডেট: ১০ অক্টোবর ২০১৮ ।

কোলকাতায় সিভিল সাপ্লাই ডিপার্টমেন্টে সাব-ইন্সপেক্টরের চাকরি হয়েছিল তাঁর। মাসিক বেতন ছিল ৭০ টাকা। একবার এক গুদাম পরিদর্শনকালে খাদ্য মজুদের হিসাবে গড়মিল বেড়িয়ে আসার পর অভিযুক্ত মজুদদার নিজেকে বাঁচাতে ঘুষ হিসেবে তাঁর পকেটে ১০০ টাকা গুঁজে দেওয়ার চেষ্টা করেন। অন্য গুদামগুলোতেও সেই একই চিত্র। কিন্তু তিনি অত্যন্ত কঠোর। মজুদদাররা কোনভাবেই তাঁকে ম্যানেজ করতে পারছিলেন না। এমনকি ঘুষের অঙ্ক বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েও না।
এক পর্যায়ে পরিস্থিতি এমন হলো যে হয় ঘুষ গ্রহণে অভ্যস্ত হতে হবে নয়তো চাকরি ছাড়তে হবে। তবে সততার স্বার্থে সেদিন দ্বিতীয় পন্থাকে বেছে নেওয়াকেই যিনি শ্রেয় মনে করেছিলেন তিনি হলেন বগুড়ার প্রবীণ শিক্ষাবিদ তাজমিলুর রহমান। ১৯৪৪ সালে বি.এ পাশ করার পর সেটাই ছিল তাঁর প্রথম চাকরি। বগুড়ার তৎকালীন নওয়াব মোহাম্মদ আলীর (পরবর্তীতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী) সুপারিশে মাত্র ১৯ বছর বয়সে ওই চাকরিটি জুটেছিল। প্রথম সেই চাকরি পাওয়া নিয়েও কিংবদন্তী রয়েছে।
তখন গ্রাম-গঞ্জে নগদ টাকার খুব সংকট। যে কারণে এলাকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যেমন মসজিদ, মন্দির কিংবা স্কুলের উন্নয়নে যুবকরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে টাকার পরিবর্তে ফসল সংগ্রহ করতেন। পরে তা হাটে বিক্রি করে টাকার যোগান দেওয়া হতো। পূর্ব বগুড়ার বাসিন্দা সদ্য বি.এ পাশ তাজমিলুর রহমানও তার বন্ধুদের নিয়ে এলাকার স্কুলের উন্নয়নে বাড়ি বাড়ি গিয়ে মরিচ সংগ্রহে (ওই এলাকায় তখন ধানের চেয়ে মরিচের ফলন বেশি হতো) নেমে পড়েন। এলাকার সেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য আর্থিক সহায়তা পাওয়ার আশায় তারা কয়েক বন্ধু মিলে একদিন বগুড়া শহরের নওয়াব প্যালেসে গিয়ে মোহাম্মদ আলীর সঙ্গে দেখা করেন। সব কিছু শুনে বি.এ পাশ করার পরেও বেকার বসে থাকার কারণে তিনি তাজমিলুর রহমানকে কিছুটা ভর্ৎসনা করেন। এরপর নওয়াব মোহাম্মদ আলী একটি চিঠি লিখে তার হাতে দিয়ে সেটি কালাকাতায় গিয়ে সিভিল সাপ্লাই ডিপার্টমেন্টের উচ্চপদস্থ এক কর্মকর্তাকে দেওয়ার জন্য বলেছিলেন। সেই চিঠির সূত্র ধরেই পরে ওই চাকরিটি পেয়ে যান তিনি।
তাজমিলুর রহমান ১৯২৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারি বগুড়া সদরের মেঘাগাছা গ্রামে কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। শহরের পৌর উচ্চ বিদ্যালয় (বাংলা স্কুল নামে অধিক পরিচিত)  থেকে প্রাথমিক শেষ করে ১৯৩৫ সালে তিনি বগুড়া জিলা স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হন। তখন স্কুলটিতে ছাত্র ছিল প্রায় ৩৫০জন। এর মধ্যে মুসলিম ছাত্রদের সংখ্যা ছিল খুবই নগন্য। চরম দারিদ্র এবং প্রতিকুল পরিস্থিতির মধ্যেও পড়ালেখা চালিয়ে গেছেন তিনি। ১৯৪০ সালে ম্যাট্রিকুলেশন (বর্তমানে এসএসএসসি) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তিনি বগুড়া আজিজুল হক কলেজ থেকে আই.এ (উচ্চ মাধ্যমিক) এবং বি.এ পাশ করেন।

কোলকাতায় চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে ফেরার পর তাজমিলুর রহমান নিজ জেলা বগুড়ার ঘরে ঘরে শিক্ষার আলো জ্বালানোর ব্রত নিয়ে শিক্ষকতাকেই পেশা হিসেবে বেছে নেন। যোগদান করেন জেলার গাবতলী হাইস্কুলে। সেখানে দু’ বছর দায়িত্ব পালনের পর ১৯৪৯ সালে যোগদেন বগুড়া শহরের করোনেশন ইন্সটিটিউশনে। পরে ১৯৫২ সালে বগুড়া জিলা স্কুলে যোগদান করেন সহকারি শিক্ষক হিসেবে। দীর্ঘ ৪৫ বছরের শিক্ষকতা জীবনের বড় একটি সময় তিনি কাটিয়েছেন ওই স্কুলটিতে। তিনি ঐতিহ্যবাহী ওই স্কুলে পর্যায়ক্রমে সহকারি প্রধান শিক্ষক এবং প্রধান শিক্ষক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।বগুড়া জিলা স্কুলে তাঁর যোগদানের অল্পদিনের মধ্যে ভাষা আন্দোলন শুরু হয়ে যায়। সরকারি কর্মচারী হওয়ায় নিজে সেই আন্দোলনে শরীক হতে না পারলেও প্রতিষ্ঠানের ছাত্রদের নিয়মিত মিছিল-মিটিংয়ে পাঠাতেন তিনি। উত্তাল আন্দোলনের সেই দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে শিক্ষ আন্দোলন মঞ্চের বগুড়া শাখার আহবায়ক শ্যামল ভট্টাচার্য জানান, তখন তিনি জিলা স্কুলে ৬ষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র। সরকারি আমলাদের ছেলেরাই সেখানে বেশি পড়তো বলে অন্য স্কুলের ছাত্রদের মিছিল করানো যতটা সহজ জিলা স্কুলের ক্ষেত্রে ততটাই কঠিন ছিল। যে কারণে আন্দোলনরত ছাত্র ইউনিয়নের নেতা-কর্মীরা সীমানা প্রাচীরের বাইরে চোঙা ফুকিয়ে (তখন মাইক ছিল না) জিলা স্কুলের ছাত্রদের আন্দোলনে শরীক হওয়ার আহবান জানাতেন। একদিন নেতা-কর্মীরা দলবেঁধে স্কুলের ভেতর ঢুকে সব ছাত্রকে মিছিলে নিয়ে যান।
বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের জেলা সংগঠক শ্যামল ভট্টাচার্য জানান, সে সময় বগুড়া জিলা স্কুলের শিক্ষকদের মধ্যে তাজমিলুর রহমান অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন। সরকারি চাপ থাকায় ইচ্ছা করলে তিনি ছাত্রদেরকে মিছিলে যেতে বাধা দিতে পারতেন; কিন্তু সেটা করেন নি। বরং ছাত্রদের আন্দোলনের প্রতি নৈতিক সমর্থন জানিয়েছেন। যে কারণে তার মত বিভিন্ন শ্রেণীর ৩০০/৪০০ ছাত্র স্কুল থেকে বেড়িয়ে সেদিন রাজপথের মিছিলে যোগ দিতে পেরেছিলেন। তাজমিলুর রহমান ছাত্রদের মিছিলে পাঠিয়ে চুপ করে বসে থাকেন নি। তারা মিছিল নিয়ে শহরের কেন্দ্রস্থল সাতমাথার বটতলার (বর্তমানে বীর শ্রেষ্ঠ চত্বর) দিকে এগিয়ে যাওয়ার পর পুলিশ লাঠিচার্জ শুরু করলে তিনি এগিয়ে গিয়ে তাদের রক্ষাও করেন। তাছাড়া আটক অনেক ছাত্রকে পুলিশের কাছ থেকে ছাড়িয়েও এনেছিলেন।
শিক্ষাবিদ শ্যামল ভট্টাচার্য তাঁর শিক্ষক তাজমিলুর রহমানকে ‘আদর্শ শিক্ষক’ উল্লেখ করে বলেন, “আমি সেইসব সৌভাগ্যবানদের একজন যারা তাজমিলুর রহমান স্যারকে শিক্ষক এবং পরবর্তীতে একই স্কুলে সিনিয়র সহকর্মী হিসেবে পেয়েছিলাম। তিনি ক্লাসে শুধু বই ধরে পড়াতেন না। পাঠ্য বইয়ের বাইরেও নানা রকম গল্প বলতেন। বাংলার শিক্ষক হয়েও তিনি  জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা বিষয়ে পড়াতেন।” পারিবারিকভাবে ঘনিষ্ঠ হওয়ার কারণে উভয়ের মধ্যে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে ওঠার কথা জানিয়ে শ্যামল ভট্টাচার্য আরও বলেন, ‘স্যার আগে থেকেই লেখালেখি করতেন। মাঝে একবার বগুড়া থেকে দিনাজপুর জিলা স্কুলে বদলী হওয়ার পর সেখানে কবি কাজী কাদের নেওয়াজকে প্রধান শিক্ষক হিসেবে পাওয়ায় তাঁর সাহিত্য চর্চা আরও বেড়ে যায়। তিনি প্রচুর গল্প ও নাটক লিখেছেন। নিজের লেখা অনেক নাটকে ছাত্রদের সঙ্গে নিজে অভিনয়ও করেছেন। নীরস বিষয়গুলোকে তিনি সরস করে উপস্থাপন করতে পারতেন। যে কারণে আমরা তাঁর ক্লাসের প্রতি খুবই আগ্রহী ছিলাম। তাঁর পাঠদান পদ্ধতি এতটাই সমৃদ্ধ ছিল যে শিক্ষকতা পেশায় আসার পর আমি  তাঁকে অনুসরণের চেষ্টা করেছি।’
বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজের (শজিমেক) সাবেক অধ্যক্ষ প্রফেসর ডা. মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল জানান, তাজমিলুর রহমান একজন পরিপুর্ণ সংস্কৃতিবান মানুষ। যে কারণে তাঁর যোগদানের পর থেকেই বগুড়া জিলা স্কুলে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড চাঙ্গা হয়ে উঠতে শুরু করে। তাঁর সময়ে স্কুলে নিয়মিত নাটক, আবৃত্তি, বিতর্ক এবং রচনা প্রতিযোগিতা হতো। সে সময় তাজমিলুর রহমানের অনুপ্রেরণাতেই তার মত অনেক ছাত্রই জাতীয় পর্যায়ে বিতর্ক ও রচনা প্রতিযোগিতায় ওই স্কুল থেকে একাধিকবার প্রথম হওয়ার গৌরব অর্জন করেছিলেন। সবচেয়ে মজার বিষয় ছিল প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের নাম স্কুলে আসার পর তা স্কুলের ছাত্র সমাবেশে (অ্যাসেমব্লি) ঘোষণা করা হতো। এতে অন্যান্য ছাত্রদের মধ্যেও আগ্রহ জন্মাতো। যার ফলে প্রতি বছর ওইসব প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারীর সংখ্যাও বাড়তো।
তাজমিলুর রহমান তাঁর লেখা নাটকে স্কুলের ছাত্রদের অভিনয়ের সুযোগ দিতেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রায় এক বছর আগে ১৯৭০ সালের গোড়ার দিকে দেশ প্রেমের ওপর লেখা নাটক ‘মীর কাসিম’ বগুড়া জিলা স্কুলে মঞ্চস্থ হয়। ওই নাটকে যেসব ছাত্র অভিনয় করেছিলেন তাদের মধ্যে দোলন ও টিটু নামে দুই ছাত্র ১৯৭১ সালে পাক বাহিনীর সঙ্গে প্রতিরোধ যুদ্ধে শহীদ হন। যে কারণে নাটকটি সবার মনে দাগ কেটেছে। তাজমিলুর রহমান সম্পর্কে ডা. মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল বলেন, ‘স্যার নিয়ম-শৃঙ্খলা মেনে চলা মানুষ। তাই তিনিও চাইতেন আমরা অর্থাৎ তাঁর ছাত্ররাও যেন নিয়ম মেনে চলি। তবে আশ্চর্যের বিষয় ছিল কড়া শাসনের কারণে তাকে কেউ ভয় পেতো না বরং সবাই তাঁকে পরম শ্রদ্ধা করতেন। বাংলা ব্যকরণের ওপর তাঁর জ্ঞান ছিল অগাধ। সুন্দর করে বাংলা বলা এবং লেখার ব্যাপারে তিনি খুবই যত্নবান।’
বগুড়া জিলা স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র নাট্যকর্মী তৌফিক হাসান ময়না জানান, তাজমিলুর রহমান আগা-গোড়া একজন সৃষ্টিশীল মানুষ। গল্প ও নাটকের পাশাপাশি রম্য লেখায় তিনি খ্যাতি কুড়িয়েছেন। শিক্ষকতার পাশাপশি সংস্কৃতির প্রতিটি অঙ্গনে তাঁর পদাচারণা ছিল চোখে পড়ার মত। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, সুকান্ত ভট্টাচার্যসহ বিখ্যাত কবিদের জন্ম ও মৃত্যু দিবস এলে তিনি টিফিন পিরিয়ডে স্কুলে ছাত্রদের নিয়ে আলোচনা সভার আয়োজন করতেন। এছাড়া প্রতিবছর বার্ষিক পরীক্ষা শেষে স্কুলে বাৎসরিক নাটকের আয়োজনটাও করতেন তিনি। স্কুলের ছাত্র থাকা অবস্থায় তাজমিলুর রহমানের লেখা ও পরিচালনায় ‘কারিগর’ নাটকে অভিনয়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বগুড়া থিয়েটারের সাধারণ সম্পাদক তৌফিক হাসান ময়না বলেন, ‘স্যারের মধ্যে বহুমাত্রিকতা ছিল। যে কারণে আমরা তাঁর কাছ থেকে শিক্ষা এবং দীক্ষা দুটোই পেয়েছি।’
প্রায় তিন দশক সরকারি একাধিক স্কুলে শিক্ষকতা শেষে ১৯৮১ সালে তাজমিলুর রহমান অবসর গ্রহণ করেন। তবে সৃষ্টিশীল কাজের প্রতি তাঁর উদ্যম ছিল অটুট। যে কারণে অবসরের পরেও স্থানীয় নানা সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হন তিনি। শিক্ষার প্রসারেও নানামুখি তৎপরতা চালিয়েছেন। তাঁর ঐকান্তিক চেষ্টাতেই ১৯৮৪ সালে বগুড়ায় আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন স্কুল ও কলেজ নামে বেসরকারি একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্ম হয়। তিনি ছিলেন ওই প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ। প্রায় ৯ বছর দায়িত্ব পালনের পর ১৯৯৩ সালে তিনি অব্যাহতি নেন।
১৯৯৪ সালে বগুড়ায় শিল্পী মহাসম্মেলন উপলক্ষ্যে আয়োজিত নাট্যোৎসবে তাজমিলুর রহমান আবার মঞ্চে ফিরে আসেন। তাঁর নির্দেশনায় ‘টিপু সুলতান’ নাটক মঞ্চস্থ হয়। তিনি নিজেও নাটকটিতে অভিয়ন করেছিলেন। এরপর ১৯৯৫ সালে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের বগুড়া ক্যাম্পাসে বি.এড কোর্সের টিউটর হিসেবে যোগদান করেন। প্রায় ৮ বছর দায়িত্ব পালনের ২০০৫ সালে তিনি পুরোপুরি অবসর নেন।
বগুড়া আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন স্কুল ও কলেজের প্রাক্তন ছাত্র এবং বর্তমানে বগুড়া সরকারি আজিজুল হক কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহকারি অধ্যাপক শফি মাহমুদ বিদ্যুৎ জানান, প্রবীণ শিক্ষক তাজমিলুর রহমান ব্যাটালিয়ন স্কুলকে জিলা স্কুলের সমমানের প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছেন। সেজন্য তিনি স্কুলের দরজা-জানালা এমনকি টেবিল-চেয়ার কেনা-কাটার কাজটিও নিজে তদারক করেছেন। তিনি বলেন, ‘তাজমিলুর রহমান শুধু একটি নাম নয় বরং একটি প্রতিষ্ঠান। তাঁর দেওয়া মজবুত ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে যাওয়ার কারণে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন স্কুল ও কলেজটি আজ বগুড়ায় মানসম্মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা পেয়েছে।’
বগুড়া সংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্র ‘শকুন্তলা’র কর্ণধার সেলিম রেজা সেন্টু জানান, বগুড়া জিলা স্কুলে তাজমিলুর রহমানের ছাত্রদের মধ্যে অনেকেই আজ স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। তাদের অন্যতম হলেন: বরেণ্য ঔপন্যাসিক হুমায়ুন আহমেদ, ড. জাফর ইকবাল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. আনোয়ার হোসেন, সাবেক রাষ্ট্রদূত মোফাজ্জল করিম ও সার্কের সাবেক মহাসচিব কিউ. এ. এম. এ রহিম।
বগুড়া লেখক চক্রের সাধারণ সম্পাদক তরুণ লেখক আমির খসরু সেলিম জানান, শিক্ষাবিদ তাজমিলুর রহমান অবসর গ্রহণের আগে এবং পরে প্রচুর লিখেছেন। তবে নাটক এবং রম্য বিষয়ক লেখালেখিতেই তার আগ্রহ বেশি। তাঁর লেখা নাটকগুলো হলো: ‘বালির জ্বীন’, ‘রূপচাঁদ’, ‘ভাই’, ‘কারিগর’, ‘টোপ’, ‘যেমন খুশি তেমন সাজো’ ও ‘কবুল কর্পোরেশন’। মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি নিয়ে তাঁর নাটক ‘অনেক আঁধার পেরিয়ে’ ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের প্রেক্ষাপট নিয়ে তাঁর লেখা ‘মুজিবনামা’ একটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। তিনি বলেন, ‘তাজমিলুর রহমান সম্পর্কে আমরা যেটুকু জানি যে তিনি একাধারে নাটক লিখেছেন তাতে নিজে অভিনয়ের পাশাপাশি ছাত্রদেরও অভিনয়ের সুযোগ দিয়েছেন। স্কুলে পাঠদানের ক্ষেত্রেও তিনি অন্যদের চেয়ে ব্যতিক্রমী ছিলেন। যে কারণে বলা যায় বগুড়ায় শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিকাশে তাঁর অবদান অতুলনীয়।’
শিক্ষাবিদ তাজমিলুর রহমান ২০১২ সালের ১০ অক্টোবর বুধবার ঢাকায় বেসরকারি একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুর প্রায় পাঁচ মাস আগে ২০১২ সালের ১৯ মে এই প্রতিবেদক তাঁর সাক্ষাৎপ্রার্থী হয়েছিলেন। বগুড়া শহরের মালতিনগরে ছায়া ঘেরা ‘ছায়ানট ভবন’-এ তখন শুয়ে-বসেই দিন কাটছিল তাঁর। শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লেও মনে অনেক জোর ছিল। আলাপচারিতার ফাঁকে দিন বদলের স্বপ্ন দেখার কথা জানিয়েছিলেন তিনি। বলেছিলেন, ‘আমার শরীরের মত সমাজেও আজ নানা ব্যাধি বাসা বেঁধেছে। শুধু পাঠ্যবই কেন্দ্রিক পড়ালেখা দিয়ে কখনও এগুলো দূর করা সম্ভব নয়। আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধকে জাগাতে হবে পাশাপাশি নিজেদের সংস্কৃতিকেও আঁকড়ে ধরতে হবে। এজন্য আলোকিত মানুষ গড়া প্রয়োজন।’ 

[লেখক ব্যুরো প্রধান দৈনিক সমকাল, বগুড়া ব্যুরো]

মন্তব্য