| প্রচ্ছদ

বিশেষ সাক্ষাৎকার :আনিসুজ্জামান

আমি আর দেখা করার সুযোগ পেলাম না

পুণ্ড্রকথা ডেস্ক
পঠিত হয়েছে ৫৬ বার

জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ছিলেন বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠজন। তার জবানিতে উঠে এসেছে সংবিধান রচনা, বঙ্গবন্ধু হত্যা এবং পূর্বাপর অনেক ঘটনা। বিশেষ সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নাসির উদ্দীন ইউসুফ। পুণ্ড্রকথার পাঠকদের জন্য সমকাল অনলাইন থেকে সাক্ষাৎকারটি হবহু তুলে ধরা হলো।

নাসির উদ্দীন ইউসুফ : গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের যে সংবিধান- প্রথম সংবিধান, ১৯৭২-এ রচিত হয়; আপনি তার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। বাংলা ভাষ্যের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। আপনার সেই সময়ের কথা যদি আমাদের একটু বলতেন।

আনিসুজ্জামান : ১৯৭২ সালের এপ্রিল মাসে বাংলাদেশ গণপরিষদের প্রথম বৈঠক হয়। ১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচনে যারা পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ এবং পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদে নির্বাচিত হয়েছিলেন, সেসব সদস্য নিয়ে গণপরিষদ গঠিত হয়। এর মধ্যে বাদ যান যারা পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের সময় সহযোগিতা করেছেন। গণপরিষদের প্রথম অধিবেশনেই বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের জন্য ৩৩ সদস্যের এক কমিটি গঠিত হয়। আইন ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ড. কামাল হোসেন এই কমিটির সভাপতি হন। আমার যতদূর মনে পড়ে, '৭২ সালের এপ্রিল মাসে গণপরিষদ এ কমিটি গঠন করল। এবং মোটামুটি আশা করা হলো যে, ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বরের আগেই আমাদের সংবিধান রচনা শেষ হবে। 

আট মাসেই; ৯ মাসও না। বঙ্গবন্ধু খুব উদ্দীপ্ত ছিলেন- বাংলাদেশের প্রথম সংবিধান হতে যাচ্ছে! বাংলায় সংবিধান হতে যাচ্ছে! এবং পাকিস্তানের প্রথম সংবিধান করতে ৯ বছর লাগল; আমরা ৯ মাসেই সেটা করে ফেলব। এসব নিয়ে উনি খুব উদ্দীপ্ত ছিলেন। সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচালনার যে চার মূলনীতি, এটা সম্পর্কেও তার খুব ভাবাবেগ ছিল। তবে আমার স্পষ্টই মনে পড়ে, বঙ্গবন্ধু একাধিকবার আমাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বলেছিলেন, এই চার নীতির মধ্যে তিনি অগ্রাধিকার দেন সমাজতন্ত্রকে। আমার মনে হয় যে, এটা সবার জেনে রাখা ভালো। '৭২ সালের কথাই আমি বলছি। উনি পরবর্তী সময়ে চতুর্থ সংশোধনী করলেন তার পেছনে যে মনোভাবটা ছিল, সেটা একেবারেই হঠাৎ চুয়াত্তর-পঁচাত্তর সালে আসেনি। উনি সমাজতন্ত্রকে পয়লা জায়গায় নিয়েছিলেন। 

নাসির উদ্দীন ইউসুফ : এবং আপনি যে বাংলা ভাষ্যের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন, না আপনি শুরু থেকেই ওই কমিটির মধ্যে যুক্ত ছিলেন?

আনিসুজ্জামান : শুরু থেকে সংবিধান প্রণয়ন কমিটি গঠন হওয়ার পর ড. কামাল হোসেন আমাকে বলেন, বাংলায় মূল ভাষ্যটা বলা হবে এবং আমাকে সেটা করতে হবে। আমি তখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করি। ড. কামালকে বললাম, আমার তো কিছু সাহায্য লাগবে। তিনি বললেন, আপনি লোক বেছে নেন। আমার স্কুলজীবনের সহপাঠী নিয়ামুল বাছির, ও ছিল গণপরিষদে- বিতর্ক বিভাগে সহ-সম্পাদক, পরে সম্পাদক হয়েছিল। সে নানা ভাষা জানত। বেতারে অনেক দিন কাজ করেছে। এর পর গণপরিষদের সঙ্গে যুক্ত ছিল। কাজেই অনেক বিশাল ওর জানাশোনা। এইটা কাজে লাগবে বলে ধরে নিয়েছিলাম। আমি ওকে বললাম, আর কাকে নিতে পারি? গণপরিষদের ওর একজন সহযোগীর কথা বলল। এ কে এম সামসুজ্জামান নাম; যতদূর মনে পড়ে এখন। আমরা তিনজনে মিলে বাংলা ভাষ্যটা করি। পরে একটা কমিটি করা হয়; অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসান, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর তখন; বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক ড. মযহারুল ইসলাম এবং আমাকে নিয়ে কমিটি গঠিত হয়। আমাকে তার সদস্য সচিব করা হয়। এই কমিটি সংবিধানের বাংলা ভাষ্য চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করে। তবে কমিটি খুব যে বেশি সময় পেয়েছিল, তা না। মোটামুটি আমরা যে কাজটি করে নিয়েছিলাম, সেটি তারা অনুমোদন করেন। গণপরিষদে আনুষ্ঠানিকভাবে এই তিনজনকে ধন্যবাদ দেওয়া হয়। কিন্তু পশ্চাতে আরও দু'জন ছিল, যাদের কথা সামনে আসেনি। নিয়ামুল বাছির ও সামসুজ্জামান। উনাদের নামটা সেভাবে আসেনি।

নাসির উদ্দীন ইউসুফ : তখন কি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে এই সংবিধান রচনা নিয়ে আপনার কোনো কথাবার্তা হয়েছে?

আনিসুজ্জামান : আমাদের দপ্তরটা ছিল, এখন যেটা প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর, ওটা ছিল গণপরিষদ। ওখানে একটি ঘরে আমি বসতাম। গণপরিষদে যে আলোচনা হতো, সেই আলোচনা আমি ঘরে বসেই শুনতে পেতাম। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে প্রায়ই দেখা হতো, কথা হতো। সংবিধানের ব্যাপারে, বিশেষ করে বঙ্গবন্ধু কিছু মত দিতে চাইলে ড. কামাল হোসেনকে ডেকে পাঠাতেন। এই রকম দুইবার আমি ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে ছিলাম। নিশ্চয়, কামাল হোসেন আরও বেশিবার গেছেন। একবার বঙ্গবন্ধু বললেন, সাম্প্র্রদায়িক রাজনীতি নিষিদ্ধ করে সংবিধানে একটা অনুচ্ছেদ থাকতে হবে। এটাই পরে বাংলাদেশের সংবিধানে ৩৮ নম্বর অনুচ্ছেদে রূপ নেয়। এখানে সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে নিষিদ্ধ করা হয়। এবং সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল গঠনের পথকে বাধা দেওয়া হয়। বা বন্ধ করে দেওয়া হয়; বলা যেতে পারে। আরেকবার বঙ্গবন্ধু বললেন, পাকিস্তানের গণতন্ত্রের যে অস্থিরতা, সেইটার একটা কারণ ছিল 'ফ্লোর ক্রসিং'- সংসদ সদস্যদের এক দল থেকে আরেক দলে যাওয়া। যার জন্য দেখা যাচ্ছে যে কোনো মন্ত্রিসভা মাত্র ১৫ দিন টিকে ছিল- এ রকম। যার ফলে তৈরি হলো ৭০ নম্বর অনুচ্ছেদ, যেটা নিয়ে অনেক বিতর্ক এখনও আছে, তখনও হয়েছিল। কিন্তু এখন আরও বেশি হয়েছে; বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পরে। অনেকে বলেন, ৭০ অনুচ্ছেদ গণপরিষদের সদস্যদের অধিকার হরণ করেছে। কিন্তু আমার এখনও মনে হয়, এটি গণপরিষদের সদস্যদের অপব্যবহার রোধ করেছে।

নাসির উদ্দীন ইউসুফ : অনেকাংশে। তার কারণ অনেকে প্রলোভনে পড়ে অনেক কাজ করতে পারত। সেগুলো বন্ধ হয়ে গেছে।

আনিসুজ্জামান : তবে এখন অভিজ্ঞতার আলোকে হয়তো অন্য কোনো ব্যবস্থার কথা ভাবতে পারি। তারপর যখন গণপরিষদে সংবিধানের খসড়া নিয়ে আলোচনা হয়েছে, তখন বিরোধী দলের সদস্য ছিলেন মাত্র দু'জন- ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা। বঙ্গবন্ধু একদিন আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের বক্তৃতা শোনো? আমি বললাম, আমার ওপাশটা তো খোলা থাকে; কিছু কিছু শুনি। '৫৬ সালে পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র বানানোর সময় আমি যেসব কথা বলেছিলাম, সুরঞ্জিত ধরেন আমাকে সেসব কথা শোনাচ্ছে। ফুললি রেকর্ড। এই রকম মজা লেগেছিল শুনতে।

নাসির উদ্দীন ইউসুফ : অসাধারণ একটা কথা।

আনিসুজ্জামান : উনি সংবিধান রচনার অগ্রগতি সম্পর্কে নিজেকে অবহিত রাখতেন। এবং কী করলে ভালো হবে, যেমন- সংবিধানের যে কপিতে সই করা হলো, উনি শিল্পী জয়নুল আবেদিনকে ডাকলেন এবং বললেন যে, আপনি এটা তৈরি করুন। এর মধ্যে নকশা থাকবে, হাতের লেখা সবটা হবে। তখন আমি প্রস্তাব করেছিলাম, এ কে এম আব্দুর রউফ আমাদের একজন চিত্রকর। তিনি ধরেন লন্ডনে আমাদের হাইকমিশনে কাজ করছেন। ওর হাতের লেখা খুব সুন্দর ছিল; আমি বললাম যে রউফকে দিয়ে লেখালেই ভালো হবে। কেন জানি না, আমার কথা সমর্থন করলেন। তখনই বঙ্গবন্ধু বললেন যে, হাইকমিশনে জানাও, ও এখানে এসে থাকুক। পৃষ্ঠাগুলো আঁকা হলো আবেদিন সাহেবের নেতৃত্বে। হাশেম খান ছিলেন, আবুল বারকাত ছিলেন। আমরা অনেক আশা নিয়ে এবং ভালোবাসা দিয়ে সংবিধানের কাজ শুরু করেছিলাম এবং শেষও করেছিলাম।

নাসির উদ্দীন ইউসুফ : শেষ কবে হলো?

আনিসুজ্জামান : নভেম্বর মাসের ৪ তারিখে গণপরিষদে সবটা উপস্থাপন করা হলো। নভেম্বরের শেষে এটা গৃহীত হলো। এবং এতে যখন লেখা হলো, সংবিধানের একটি অনুমোদিত ইংরেজি পাঠ থাকবে; ইংরেজি-বাংলায় সংঘর্ষ হলে বাংলাটা প্রাধান্য পাবে; তখন আমি বেশ ভয়ই পেয়ে গিয়েছি যে, কোথায় কোন ভুল করলাম সেটার জন্য কী না কী হয়! পরে দেখেছি যে, না; তেমন কিছু হয়নি। কারণ ইংরেজি-বাংলা নিয়ে দুটো মামলা হয়েছিল। এটা জাস্টিস হাবিবুর রহমানের একটা লেখার মধ্যে আছে। এই দুটোতেই হাইকোর্ট বলেছিলেন যে- না, এর মধ্যে কোনো পার্থক্য হচ্ছে না।

একটি রায়ে বলা হয়েছিল, যদি কোনো পার্থক্য থেকেও থাকে, বাংলা ভাষাটা ইংরেজি ভাষার থেকে পরিস্কার। তো, কাজেই এইদিক থেকে আমি রেহাই পেয়ে গেছি, বলা যায়। এখন তো আইন মন্ত্রণালয়ের ড্রাফটম্যানরা এই কাজগুলো করে। বাংলা সংবিধানের কোনো আদর্শ তো আমাদের সামনে ছিল না।

নাসির উদ্দীন ইউসুফ : এটা তো স্যার বাংলা ভাষার প্রথম সংবিধান, আর বাঙালির জীবনের প্রথম সংবিধান...

আনিসুজ্জামান : প্রথম সংবিধান। তা ছাড়া আমরা কেউই আইনের লোক ছিলাম না। কাজেই আমাদের কাজ খুব জটিল ছিল।

নাসির উদ্দীন ইউসুফ : আমাদের যারা আইনের সাংসদ ছিলেন, তাদের সঙ্গে তো আপনাদের নিশ্চয়...

আনিসুজ্জামান : হ্যাঁ, খসড়া প্রণয়ন কমিটির প্রত্যেক বৈঠকে আমি উপস্থিত থাকতাম। ড. কামাল হোসেন বাংলা ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন করতেন। তাদের কথা শুনতে হতো, ব্যাখ্যা করতে হতো। তবে আমি বলি যে, ড. কামাল হোসেনের অবদান খুব বেশি। সংবিধানের ইংরেজি ভার্সন তার নিজ হাতে করা। তার পরে আমি যখন তাকে অনুরোধ করেছি যে, কোনো একটি বিভাগ যেভাবে বাংলায় করতে চাই, তাতে ইংরেজিটা একটু বদলে দেওয়া দরকার। বদলে দিয়েছেন। ফলে এই দুটোর সামঞ্জস্যটা হয়েছে। উনি এটা না করলে আমি কাজটা এভাবে এগিয়ে নিতে পারতাম না।

নাসির উদ্দীন ইউসুফ : স্যার, এই যে আপনি বললেন, বঙ্গবন্ধু বলেছেন, সাম্প্রদায়িকতা নিষিদ্ধ থাকতে হবে। আর একটা হচ্ছে সমাজতন্ত্র, মানুষের সমঅধিকার। উন্নত সংস্কৃতির মানুষের এটা মনোভাবনা হতে পারে, চিন্তা-চেতনা হতে পারে। যে রাজনৈতিক আবহের মধ্যে থেকে বঙ্গবন্ধু বড় হয়েছেন, যে সংগ্রাম এবং পাকিস্তানপূর্বকাল ও পাকিস্তানকাল। আপনি তো পুরোটা তাকে খেয়াল করেছেন। কবে থেকে আপনি বঙ্গবন্ধুকে চিনেছেন?

আনিসুজ্জামান : আমি তাকে প্রথম দেখি ১৯৫৬ সালে, চীনে বিশ্বশান্তি সম্মেলন হয়েছিল; তিনি গিয়েছিলেন পাকিস্তান প্রতিনিধি দলের সঙ্গে। যারা পূর্ববাংলা থেকে গিয়েছিলেন, ওরা ফিরে আসার পরে একটা সংবর্ধনা হয় ঢাকা জেলা পরিষদ মিলনায়তনে। ওইখানে তাকে প্রথম দেখলাম। তারপরে যখন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি গঠিত হলো, তখন আওয়ামী লীগের সঙ্গে দ্বন্দ্বে পল্টন ময়দানের জনসভা পণ্ড হয়ে গেল। তখন আমাদের এক বন্ধু আহতও হলো। আমি তাকে দেখতে হাসপাতালে গেছি, তখন বঙ্গবন্ধু এলেন। তারপরে হয়তো এদিক-ওদিক দেখা হয়েছে। কিন্তু বিশেষ করে '৬৯ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে মুক্তিলাভ করার পরে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগটা বেশি হয়।

একটা ঘটনা বলি, আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১০ বছর অধ্যাপনা করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিতে যাই ১৯৬৯ সালের ৩ জুন। আমি গাড়ি চালিয়ে চট্টগ্রাম যাচ্ছিলাম, কুমিল্লার চান্দিনার কাছে গিয়ে মোটর দুর্ঘটনায় আহত হয়ে ফিরে আসি। বঙ্গবন্ধু আমাকে দেখতে এলেন, আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসে। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন। তখন খাদ্যমন্ত্রী আব্দুল মোমিন, উনি বাসায় ছিলেন।

নাসির উদ্দীন ইউসুফ : তখন বাসা কোথায়, স্যার?

আনিসুজ্জামান : নীলক্ষেতে। '৬৯ সালের জুন মাসে বঙ্গবন্ধু আমার বাসায় এলেন। এমনি কথাটথা বললেন- এই কেমন আছি, ইত্যাদি। তারপরে উনি যখন উঠেছেন চলে যাওয়ার জন্য, তখন আমার পাঁচ বছর বয়সের মেয়ে রুচি, ও এসে আমার কানের কাছে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করছে- আসাদ আসেনি? মানে তখন ছেলেরা মিছিল করত- 'আসাদের রক্ত বৃথা যেতে দেব না। জেলের তালা ভাঙব, শেখ মুজিবকে আনব।' তো, রুচির ধারণা হয়েছে, আসাদ আর একজন বঙ্গবন্ধুর মতোই নেতা। বঙ্গবন্ধু আমাকে বললেন, তোমার মেয়ে কী বলে? আমি বললাম- আসাদ আসেনি, তাই জিজ্ঞেস করল। তো, বঙ্গবন্ধু ওর গালটা ধরে বললেন যে, ওরা আমার কাছে এই কৈফিয়ত তো চাইতেই পারে। আমি খুব মুগ্ধ হয়েছিলাম।

নাসির উদ্দীন ইউসুফ : আমি স্যার আর একটি জিনিস জানতে চাইব। এই যে সমাজতন্ত্রের কথা বলা অথবা অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের কথা বলা; আজকের পটভূমিতে ভীষণ জরুরি। আমাদের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নেতৃত্ব দিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধের। তিনি এই বিষয়গুলো অত্যন্ত পরিস্কারভাবে আপনাদের মাধ্যমে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

আনিসুজ্জামান : সংবিধানে চার মূলনীতির কথা আছে। সেগুলো প্রায় সমান গুরুত্ব পাওয়ার। তবে আমি একটু আগে এ কথা বললাম যে- বঙ্গবন্ধু নিজে এই চারটিকেই গুরুত্ব দিয়েছিলেন। কিন্তু এর মধ্যে যদি তারতম্য করতে হয়, সমাজতন্ত্রে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। এইটা উনি ঠিক কবে থেকে ধারণ করলেন, বলা মুশকিল। আমার যতদূর মনে পড়ে, '৬৬ সালে আওয়ামী লীগের যে ঘোষণাপত্র, তাতে সমাজতন্ত্রের কথা ছিল। '৭০ সালের নির্বাচনের পরে বঙ্গবন্ধু করাচির 'ডন' পত্রিকায় একটা সাক্ষাৎকার দেন। খুব সম্ভব পয়লা মার্চে এটা বের হয়েছিল। সেইখানে উনি বলেছিলেন, আমার লক্ষ্য সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা। অনেকেই বলে যে, আওয়ামী লীগ তো উঠতি ধনতান্ত্রিকদের সংগঠন; সমাজতন্ত্রের কথা তারা আন্তরিকভাবে বলে না। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর কাছে এটা একটা আন্তরিক ব্যাপার ছিল।

নাসির উদ্দীন ইউসুফ : আর একটা বিষয় স্যার, '৭২ থেকে '৭৫- এ সময়ে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কোনো সাক্ষাৎ বা কোনো স্মৃতি আপনার আছে?

আনিসুজ্জামান : দুটো কাজের সঙ্গে আমি জড়িত ছিলাম। একটা হচ্ছে সংবিধানের কথা বললাম, আর একটা হচ্ছে বাংলাদেশ শিক্ষা কমিশনে, যার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ড. মুহাম্মাদ কুদরাত-এ-খুদা। শিক্ষা কমিশন গঠন হওয়ার পর এর উদ্বোধন হতে অনেক সময় নিয়েছিল। কারণ তখন ছাত্ররা বলছে- শিক্ষা কমিশনে তাদের প্রতিনিধিত্ব থাকতে হবে। এটা নিয়ে একটা অচল অবস্থা। শিক্ষা কমিশনের উদ্বোধন করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু একটা লম্বা বক্তৃতা দিলেন। বক্তৃতার পরে তিনি বললেন, আপনাদের কোনো প্রশ্ন থাকলে করেন। আমি দুটো প্রশ্ন করেছিলাম। বলেছিলাম যে, আমাদের জাতীয় আয়ের কতভাগ শিক্ষার জন্য ব্যয় করা হবে? এটা যদি সরকার আমাদের বলে দেয়, তাহলে আমরা সেই মতো সুপারিশ করতে পারি। আর বলেছিলাম যে, শিক্ষা কমিশন সরকার গ্রহণ করুক বা না করুক, এর দ্বিমত পোষণকারী মন্তব্যসহ এটা ছাপতে হবে। বঙ্গবন্ধু প্রথম প্রশ্নের উত্তরে বললেন যে, আপনারা টাকা-পয়সার কথা ভাববেন না। আমি ভিক্ষা করে হলেও টাকা-পয়সা জোগাড় করে দেব। কিন্তু আমি চাই যে দেশের জন্য একটি ভালো শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তন করতে। আপনারা আপনাদের সাধ্যমতো একটা ভালো ব্যবস্থার কথা বলেন। আর কমিশন রিপোর্ট প্রকাশ করার ব্যাপারে উনি বললেন যে, বাংলাদেশ সরকারের কিছুই তো গোপন থাকে না; সবই প্রকাশ হয়ে যায়। এটাও হবে। আমি বললাম- না, ওই রকম প্রকাশ চাই না। সরকারিভাবেই প্রকাশ হলে চলবে। এ তো '৭২ সালের কথা বললাম। '৭৪ সালের মে মাসে ড. কুদরাত-এ-খুদার নেতৃত্বে কমিশনের সব সদস্য রিপোর্ট দিতে গেলাম বঙ্গবন্ধুর কাছে। বঙ্গবন্ধু এলেন এবং আরম্ভ করার আগেই আমার দিকে তাকিয়ে বললেন যে, তুমি সবার শেষে আমার সঙ্গে দেখা করে যেও। বললাম, আচ্ছা। যখন দেখা করতে গেলাম, উনি বললেন- তোমরা নাকি এমন রিপোর্ট তৈরি করেছ, যেটা বাস্তবায়ন করতে গেলে আমার পুরো বাজেট চলে যাবে। আমি বললাম, আপনি কি পড়েছেন পুরো রিপোর্ট? বললেন, আমার পড়ার সময় কোথায়? আমাকে আমলারা যা বলেছে, আমি তার থেকে বলছি। আমি বললাম যে, এটা ঠিক না; সব স্কুলেই লাইব্রেরি থাকা দরকার। আমরা আর্থিক বিবেচনায় বলেছি, ইউনিয়ন পর্যায়ে লাইব্রেরি থাকবে। এই কথাবার্তা হলো। বঙ্গবন্ধু যখন মস্কো থেকে ফিরে এসেছেন, অসুস্থ ছিলেন কিছুদিন। তো, আমি জিজ্ঞেস করলাম যে, কেমন আছেন? উনি বললেন যে, আমি ভালো নেই, আমি মস্কো থেকে চলে এলাম চিকিৎসা অসমাপ্ত রেখে। তার কারণ যখন শুনলাম যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসে সাতজন ছাত্রকে হত্যা করা হয়েছে, তখন আমি আর ওখানে থাকতে পারলাম না। বললাম যে, দেশে আপনি বিশ্রাম নেন। বললাম যে, ঢাকায় বিশ্রাম নেন। বললেন- কীভাবে নেব? লোক তো আসেই সব সময়।

আমি বললাম যে, ঢাকার বাইরে যান; লোককে দেখা দেবেন না। তখন তার চোখে প্রায় পানি চলে আসছে। বলছেন যে, লোককে খেতে দিতে পারছি না, পরতে দিতে পারছি না। এখন যদি দেখা দিতে না পারি, তাহলে আর আমার কী থাকবে! এইটা একটা আবেগের কথা। কিন্তু একেবারে প্রাণের কথা। ওই দিনই উনি আমাকে বললেন যে, কবীর চৌধুরী তখন শিক্ষা সচিবের দায়িত্বে আছে। উনি ওটা ছেড়ে দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিলেন। উনি বললেন যে, আমি চাই তুমি শিক্ষা সচিবের দায়িত্ব নাও। বললাম যে, আমি পারব না। প্রথমত, এই কাজ আমার নয়। দ্বিতীয়ত, আমি লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার একটা সুযোগ পেয়েছি, আমাকে ঘুরে আসতে দিন। বললেন যে, ভাবো আর কালকে এসে আবার বলো। তো আমি বললাম, তারপর বললেন যে- আচ্ছা ঠিক আছে, তুমি যাও বিলেতে, তারপর ফিরে এসে আমার সঙ্গে দেখা করে চাটগাঁও যাবে বা যেখানে যাবার যাবে। আমি ফিরে এলাম '৭৫ সালের ১১/১২ আগস্টে। ১৫ তারিখে তো মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেই গেল। আমি আর উনার সঙ্গে দেখা করার সুযোগও পেলাম না। 

নাসির উদ্দীন ইউসুফ : আপনি তখন কোথায় ছিলেন, যখন হত্যাকাণ্ডের কথা আপনি শোনেন?

আনিসুজ্জামান : আমার আব্বা রেডিওতে শুনলেন। রেডিওতে শুনেই উনি আমাকে ডেকে জানালেন। আমিও তখন শুনলাম রেডিওতে; ডালিমের সেই ঘোষণা। তারপরে আমি বেরিয়ে গেলাম। ড. কামাল হোসেন তখন অক্সফোর্ডে ছিলেন। তার পরিবার ছিল ঢাকায়। তো প্রথমত, আমি ওদের খবর নিতে গেলাম। পুরো বিষয়টা এত আকস্মিক যে, বুঝে উঠতে সময় লেগেছিল। একজন মানুষ, দেশটাকে যিনি স্বাধীন করে গিয়েছেন, মুক্তির পথ দেখিয়েছেন, সেই লোকটার মৃত্যুতে আমরা নিশ্চিতভাবে একটি বড় ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছি।

নাসির উদ্দীন ইউসুফ : যে মানুষটি দেশকে স্বাধীন করে দিয়েছেন, সে মানুষের হত্যা আমাদের ইতিহাসের সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনা।

আনিসুজ্জামান : নিশ্চয়ই। বঙ্গবন্ধু হত্যা হয়েছে শুনে আমার মনে হয়েছে, বাংলাদেশকে পাকিস্তানের ভাবমূর্তি দেওয়ার চেষ্টার নামান্তর। এবং আমার তখনই শুনে মনে হয়েছিল যে, এর সঙ্গে পাকিস্তানের একটা সম্পৃক্ততা আছে। আমরা ওভাবে প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা পাইনি, কিন্তু বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিদেশে থাকার আয়োজন করার ব্যাপারে যে পাকিস্তানের হাত রয়েছে, বিশেষ করে লিবিয়ায়; এটা তো সবাই জানে।

নাসির উদ্দীন ইউসুফ : জানতে চাইব, আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন বঙ্গবন্ধুকে- একজন বাঙালি হিসেবে।

আনিসুজ্জামান : মানে এইভাবে যদি দেখি যে, পূর্ববাংলার একটি মহকুমা শহরের বড় হওয়া মানুষ। কলকাতায় রাজনীতি করতেন। এবং সেখানে সম্পূর্ণ আন্তরিকতার সঙ্গে, দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করেছেন। দুর্ভিক্ষের সময় লঙ্গরখানায় কাজ করেছেন। দাঙ্গার সময় মুসলমান মেয়েদের উদ্ধার করে নিরাপদে নিয়ে এসেছেন। আবার হিন্দু শিক্ষককে নিরাপদে এলাকা পার করে দিয়েছেন। এই যে নানা রকম দিক তার। একদিনে তো গড়ে নাই। তিলে তিলে নিজেকে তৈরি করেছেন তিনি আসলে। এবং প্রত্যেকটি ক্ষেত্রেই মানুষের কল্যাণের জন্য নিবেদিত। এই যে তার 'অসমাপ্ত আত্মজীবনী', 'কারাগারের রোজনামচা'- এগুলো পড়লেই তো বোঝা যায়, কেমন দরদি মানুষ। এগুলো তো উনার চরিত্রের অপরিহার্য দিক। মানুষের জন্য তার যে অনুভূতি, মানুষের দুঃখ-কষ্ট দূর করার জন্য, তার কল্যাণ করার জন্য চেষ্টা, এইটা একদম বানানো ব্যাপার নয়। এটা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসার পরের ব্যাপার নয়। এটা একেবারে প্রথম থেকেই। কাজেই বলা যায় যে, নেতৃত্বের গুণ ছিল এবং মানুষের প্রতি ভালোবাসা, মানুষকে সেবা করার সম্পূর্ণ চেষ্টা ছিল বঙ্গবন্ধুর। মানুষকে সেবা করতে করতেই তো তিনি প্রাণ দিলেন।

মন্তব্য