| প্রচ্ছদ

আমার মেয়েই তো কোরবানি হয়ে গেছে: মিন্নির বাবা

পুণ্ড্রকথা ডেস্ক
পঠিত হয়েছে ২৮ বার। প্রকাশ: ১৬ অগাস্ট ২০১৯ ।

বরগুনায় রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় প্রধান সাক্ষী থেকে আসামি বনে যাওয়া তার স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নির সঙ্গে ঈদুল আজহার দিন কারাগারে দেখা করেছেন পরিবারের সদস্যরা। 

তারা মিন্নির সঙ্গে দেখা করে তাকে পোলাও-মাংসসহ বিভিন্ন খাবার দিয়ে আসেন। 

মিন্নির সঙ্গে দেখা করে খাবার দিয়ে আসতে পারলেও তাকে ছাড়া ঈদ উৎসব উদযাপন করতে পারেনি পরিবারটি। 

মেয়ে কারাগারে বন্দি থাকায় ঈদের আনন্দের পরিবর্তে যেন বিষাদ ভর করেছে পুরো পরিবারে। 

এমনকি প্রতি বছর মিন্নির বাবা ও দুই চাচা মিলে একসঙ্গে কোরবানি দিলেও এবার পরিবারের প্রিয় সদস্যকে নিয়ে উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে কোরবানিও দিতে পারেননি তারা।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে গতকাল বৃহস্পতিবার মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোর আক্ষেপ করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কুরবানি কী দিমু? আমার মেয়েই তো কুরবানি হয়ে গেছে। রিফাতের খুনিদের বাঁচাইতে আমার মেয়েকে জবাই দিয়েছে ওরা। আমার নিরপরাধ মেয়েটারে ষড়যন্ত্র করে ফাঁসাইয়া খুনিদের বাঁচানোর চেষ্টা করছে।’

মিন্নির বাবা বলেন, ‘প্রতি বছর আমরা তিন ভাই মিলে একসঙ্গে কুরবানি দেই। সবাই একসঙ্গে কত আনন্দ-ফুর্তি করে। কিন্তু এ বছর কোনো আনন্দ-ফুর্তি নাই। কুরবানিও দিতে পারি নাই। মেয়ের শোকে ওর মা অসুস্থ হয়ে পড়ছে। ছোট ছোট দুই ভাইবোনের খাওয়া-দাওয়া বন্ধ। কুরবানি দিব কীভাবে?’

মিন্নির সঙ্গে ঈদের দিন কারাগারে দেখা হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কুরবানির দিন মিন্নির মাসহ ওর চাচা-চাচি, খালা-খালু ও ভাই-বোন নিয়ে দেখা করেছিলাম। আমার মেয়েটা ঠিকমতো কথা বলতে পারে না, শুধু কান্না করে আর বলে আমাকে এই জেলখানা থেকে নিয়ে যাও। মেয়ের কান্না আমার আর সহ্য হয় না। আমি কী অন্যায় করেছিলাম, আল্লাহ আমার মেয়েটাকে এভাবে বিনা অপরাধে শাস্তি দিচ্ছে।’ আরও বলেন, ‘মিন্নির জন্য ওর খালারা ভাত, মাংস, মাছ ও পোলাও রান্না করে নিয়ে গেছিল। সেগুলো ওকে দিয়ে আসছি। ১৫ মিনিটের মতো আমার মেয়েটাকে দেখতে পেরেছিলাম। ওর কান্নাকাটিতে আমাদের কান্না চলে আসছিল, তাই আর বেশিক্ষণ কথা বলতে পারি নাই। এরপর আরও দুদিন খাবার নিয়ে গেছিলাম, কিন্তু খাবার দিতে পারলেও ওর সঙ্গে আর দেখা করতে পারি নাই।’

প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে যোগসাজশে পুলিশ তার মেয়েকে ফাঁসাচ্ছে দাবি করে মিন্নির বাবা বলেন, ‘এখন পুলিশ যা করবে বা পুলিশকে দিয়ে প্রভাবশালীরা যা করাবে তা দেখা ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় নেই। তবে আল্লাহর কাছে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পরে শুধু একটাই প্রার্থনা করি, আমার মেয়েকে যারা ফাঁসিয়েছে আল্লাহ যেন তাদের বিচার করে।’

অন্যদিকে মিন্নির মা মিলি আক্তার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার নিরীহ মেয়েটার কষ্ট আমাদের সহ্য হয় না। যে মেয়েকে ছাড়া একটা ঈদও আমরা করি নাই, সেই মেয়ে এখন জেলহাজতে। আমরা ঈদ করব কীভাবে? আমার মেয়ের কষ্ট সহ্য হয় না। শুধু আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় নাই। প্রতি বছর কত আনন্দ-ফুর্তি হয়, সবাই একসঙ্গে ঈদ পালন করি। কিন্তু আমার মেয়েটা বিনা অপরাধে জেলখানায় থাকায় কিছুই করতে পারি নাই।’

এদিকে বরগুনার জেল সুপার আনোয়ার হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঈদের দিনসহ তিন দিন মিন্নির পরিবারের পক্ষ থেকে জেলখানায় মিন্নিকে খাবার দেওয়া হয়েছিল। সেসব খাবার তাকে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ঈদ উপলক্ষে জেলখানার সব হাজতির জন্য যে বিশেষ খাবারের ব্যবস্থা ছিল তাও খেতে দেওয়া হয়েছিল মিন্নিকে।’

২৬ জুন প্রকাশ্যে বহু পথচারীর সামনে রিফাত শরীফ খুন হওয়ার পরদিন ১২ জনকে আসামি করে মামলা করেন তার বাবা (মিন্নির শ্বশুর) আবদুল হালিম দুলাল শরীফ। সেখানে এক নম্বর সাক্ষী করা হয় মিন্নিকে। এরই মধ্যে রিফাত হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী সাব্বির আহমেদ ওরফে নয়ন বন্ড পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়।  ১৩ জুলাই বরগুনা প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে তার ছেলে হত্যায় পুত্রবধূ মিন্নির জড়িত থাকার অভিযোগ করেন রিফাতের বাবা দুলাল শরীফ।

এরপর ১৬ জুলাই সকালে বরগুনার পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে দিনভর জিজ্ঞাসাবাদের পর সন্ধ্যায় রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ডে সংশ্লিষ্টতায় প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়ে মিন্নিকে গ্রেপ্তারের কথা জানায় বরগুনা পুলিশ।

রিমান্ডে নেওয়ার পর ১৯ জুলাই পুলিশ জানায়, রিফাত হত্যার সংশ্লিষ্টতায় মিন্নি ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তবে মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন দাবি করেন, তড়িঘড়ি ও জবরদস্তি করে মিন্নির কাছ থেকে জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে।

নিম্ন আদালতে দুই দফা জামিনের আবেদন নামঞ্জুর হওয়ার পর গত ৫ আগস্ট হাইকোর্টে আইনজীবীর মাধ্যমে জামিন আবেদন করেন মিন্নি। গত ২১ জুলাই বরগুনার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মিন্নির জামিনের আবেদন নামঞ্জুর হয়। এরপর ৩০ জুলাই বরগুনার জেলা ও দায়রা জজ আদালতেও তার জামিনের আবেদনে সাড়া দেয়নি আদালত।

মন্তব্য