| প্রচ্ছদ

৯০ হাজার কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি

পুণ্ড্রকথা ডেস্ক
পঠিত হয়েছে ৩২ বার
অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে গত অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র বিক্রি ৯০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এই অঙ্ক আগের বছরের চেয়ে প্রায় ১৫ শতাংশ বেশি।

জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তর সঞ্চয়পত্র বিক্রির সর্বশেষ যে তথ্য প্রকাশ করেছে তাতে দেখা যায়, গত ২০১৮-১৯ অর্থবছরে সবমিলিয়ে ৯০ হাজার ২৮০ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে। এরমধ্যে আগে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের মেয়াদ পূর্তির কারণে আসল এবং সুদ পরিশোধ করা হয়েছে ৪০  হাজার ৩৪১ কোটি টাকা।

এ হিসাবে নিট বিক্রির পরিমাণ হচ্ছে ৪৯ হাজার ৯৩৯ কোটি ৪৮  লাখ টাকা।

আগে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের সুদ-আসল পরিশোধের পর যা অবশিষ্ট থাকে, তাকে বলা হয় নিট বিক্রি। ওই অর্থ সরকারের কোষাগারে জমা থাকে এবং সরকার তা রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি বাস্তবায়নে কাজে লাগায়। বিনিময়ে সঞ্চয়পত্রের গ্রাহকদের প্রতি মাসে সুদ দিতে হয়।

এ কারণে অর্থনীতির পরিভাষায় সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রিকে সরকারের ‘ঋণ’ বা ‘ধার’ হিসেবে গণ্য করা হয়।

সঞ্চয়পত্রকে সরকার প্রতিবছরই বাজেটের ঘাটতি অর্থায়ন পূরণের অন্যতম উপায় হিসেবে বিবেচনা করে। গত  ২০১৮-১৯ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে ২৬ হাজার ১৯৭ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য থাকলেও বিক্রি বেড়ে যাওয়ায় পরে তা বাড়িয়ে ৪৫ হাজার কোটি টাকা করা হয়।

কিন্তু অর্থবছর শেষে দেখা যায়, সেই ধার গিয়ে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকেছে।

২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে সঞ্চয়পত্র থেকে ২৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য ধরেছে সরকার। এবার সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণের লক্ষ্য কম ধরা হয়েছে। তবে ব্যাংক থেকে ধার করার লক্ষ্যমাত্রা বেশ বাড়ানো হয়েছে।

২০১৮-১৯ অর্থবছরের ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ঋণের লক্ষ্য ধরা হয়েছিল ৪২ হাজার ২৯ কোটি টাকা। সঞ্চয়পত্র বিক্রি বাড়ায় পরে সেই লক্ষ্য কমিয়ে ৩০ হাজার ৮৯৫ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়।

বাজেটে সঞ্চয়পত্রের মুনাফা থেকে উৎসে কর কাটার পরিমাণ বৃদ্ধি, টিআইএন বাধ্যতামূলকসহ আরও কিছু নতুন শর্তের কারণে সঞ্চয়পত্র কম হবে ভেবে সরকার ব্যাংক থেকে ঋণের লক্ষ্য বেশি ধরেছে বলে মনে করছেন বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষক জায়েদ বখত।

বর্তমানে ব্যাংক আমানতে সুদের হার ৪ থেকে ৬ শতাংশের মধ্যে। অন্যদিকে বিভিন্ন সঞ্চয় প্রকল্পের সুদ হার ১১ থেকে ১২ শতাংশের মতো।

বেশি ‍সুদ পাওয়ার পাশাপাশি পুঁজিবাজারে খুব বেশি আশার খবর না থাকায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সঞ্চয়পত্রই সাধারণ নাগরিকদের কাছে বিনিয়োগের নিরাপদ মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সঞ্চয়পত্র বিক্রি

>> ২০১০-১১ অর্থবছরে মোট ১৭ হাজার ২৩২ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছিল। সুদ-আসল বাবদ পরিশোধ করা হয় ১৭ হাজার ১৭৫ কোটি টাকা। নিট বিক্রির পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৫৭ টাকা।

>> ২০১১-১২ অর্থবছরে বিক্রি হয় ১৮ হাজার ৯৫৫ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র। সুদ-আসল শোধ করা হয় ১৮ হাজার ৪৭৬ কোটি টাকা। নিট বিক্রি ছিল ৪৭৯ কোটি টাকা।

>> ২০১২-১৩ অর্থবছরে মোট বিক্রি হয় ২৩ হাজার ৩২৭ কোটি টাকা। শোধ করা হয় ২২ হাজার ৫৫৪ কোটি টাকা। নিট বিক্রির পরিমাণ ছিল ৭৭২ কোটি টাকা।

>> ২০১৩-১৪ অর্থবছরে বিক্রি হয় ২৪ হাজার ৩১০ কোটি টাকা। সুদ-আসল বাবদ শোধ করা হয় ১২ হাজার ৬০২ টাকা। নিট বিক্রি ছিল ১১ হাজার ৭০৭ কোটি টাকা।

>> ২০১৪-১৫ অর্থবছরে মোট বিক্রি বেড়ে দাঁড়ায় ৪২ হাজার ৬৬০ কোটি টাকায়। গ্রাহকদের পরিশোধ করা হয় ১৩ হাজার ৯২৭ কোটি টাকা। নিট বিক্রি দাড়ায় ২৮ হাজার ৭৩২ কোটি টাকা।

>> ২০১৫-১৬ অর্থবছরে মোট বিক্রি আরও বেড়ে ৫৩ হাজার ৭১২ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকে। শোধ করা হয় ২০ হাজার ২৩ কোটি টাকা। নিট বিক্রি ছিল ৩৩ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা।

>> ২০১৬-১৭ অর্থবছরে মোট বিক্রি আরও বেড়ে ৭৫ হাজার ১৩৭ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকে। শোধ করা হয় ২২ হাজার ৭১৭ কোটি টাকা। নিট বিক্রি ছিল ৫২ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা।

>> ২০১৭-১৮ অর্থবছরে মোট বিক্রি আরও বেড়ে ৭৮ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকে। শোধ করা হয় ৩২ হাজার ২৫৪ কোটি টাকা। নিট বিক্রি ছিল ৪৬ হাজার ৫৩০ কোটি টাকা।

তথ্য বিশ্লেষণ করে জায়েদ বখত বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ব্যাংকে আমানতের সুদের হার কমায় এবং পুঁজিবাজারে দীর্ঘ মন্দার কারণে সবচেয়ে নিরাপদ বিনিয়োগ সঞ্চয়পত্রের দিকে ঝুঁকেছেন সবাই।

“অনেকে মেয়াদ পূর্তির পর সেই টাকা আবার বিনিয়োগ করেছেন। মুনাফার অর্থ জমিয়ে তার সঙ্গে আরও কিছু যোগ করে নতুন বিনিয়োগ করেছেন। ডিপিএস ভাঙ্গিয়েও অনেকে বেশি লাভের জন্য সঞ্চয়পত্র কিনেছেন। যার ফলে মোট বিক্রির পাশপাশি নিট বিক্রিও বাড়ছে পাল্লা দিয়ে।”

‘মুনাফার উপর করের হার বাড়িয়েও সঞ্চয়পত্র বিক্রি খুব একটা কমবে বলে মনে না না’ জানিয়ে অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান জায়েদ বখত বলেন, “করের হার বাড়ানোর পরও অন্য যে কোন কিছুর চেয়ে সঞ্চয়পত্র থেকে বেশি মানাফা পাওয়া যাবে। শেয়ার বাজারের অবস্থা সহসা ভালো হওয়ারও কোন আভাস নেই। সে কারণে একটু বেশি লাভের আশায় সঞ্চয়পত্রেই বিনিয়োগ করবে সবাই।”

বিক্রি কমাতে ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগে উৎসে করের হার ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়। পরে পেনশনভোগীদের জন্য সঞ্চয়পত্রে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত করহার কমিয়ে ৫ শতাংশ বহাল রাখা হয়।

পরে ২৯ জুলাই সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ঘোষণা দেন, সব ধরনের সঞ্চয়পত্রে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগে উৎসে করের হার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ কাটা হবে।

বিক্রির লাগাম টেনে ধরতে এর আগে ২০১৫ সালের ১০ মে সব ধরনের সঞ্চয়পত্রের সুদ হার গড়ে ২ শতাংশ কমানো হলেও তাতে খুব বেশি কাজ হয়নি।

এরপর সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত দুই দফা সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কমানো হয়নি।

মন্তব্য