| প্রচ্ছদ

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কি ২২ আগস্টই শুরু হচ্ছে

পুণ্ড্রকথা ডেস্ক
পঠিত হয়েছে ৩৩ বার

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ২২ আগস্ট সত্যিই শুরু হবে কি-না তা নিয়ে ধোঁয়াশার সৃষ্টি হয়েছে। সংশ্নিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রত্যাবাসনের সুনির্দিষ্ট তারিখ প্রকাশ করা হলেও বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের চলমান আলোচনায় বিষয়টি ঠিক এভাবে ছিল না।

এ ব্যাপারে মিয়ানমারের রাজধানী নেপিদোর একটি দায়িত্বশীল কূটনৈতিক সূত্র জানায়, ২২ আগস্ট প্রত্যাবাসনের জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট তারিখ নির্ধারণ করা হয়নি। বরং এই তারিখকে একটি লক্ষ্য হিসেবে ধরে এই সময়ের মধ্যে প্রত্যাবাসন শুরু করা যায় কি-না সে বিষয়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে এর আগে কিছু আলোচনা হয়েছিল। এর আগেও এ ধরনের সময়ের একটি লক্ষ্যমাত্রা ধরে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু এই তারিখ থেকেই প্রত্যাবাসন শুরু হবে- এমন সুনির্দিষ্ট কোনো কিছুই এখন পর্যন্ত বলা হয়নি। খবর সমকাল অনলাইন 

এই তারিখে প্রত্যাবাসন শুরু হতেই হবে- এমন কোনো কথাও নেই। এই তারিখের মধ্যে না হলেও আলোচনা চলতে থাকবে এবং দ্রুত প্রত্যাবাসন শুরুর বিষয়ে প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। লক্ষ্যমাত্রার একটি তারিখকে সুনির্দিষ্ট তারিখ হিসেবে উল্লেখ করার মতো ভুলটিই সম্ভবত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম করেছে।

মিয়ানমার কর্তৃপক্ষকে উদ্ৃব্দত করে বার্তা সংস্থা রয়টার্স এক প্রতিবেদনে ২২ আগস্ট রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু হবে বলে উল্লেখ করেছে। এরপর থেকেই এ নিয়ে নানামুখী আলোচনাও শুরু  হয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এ তারিখের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোনো বক্তব্য দেওয়া হয়নি। গতকাল রোববার রাজধানীতে 'রোহিঙ্গা সংকট' বিষয়ক এক সেমিনারে পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক প্রত্যাবাসনের সুনির্দিষ্ট তারিখের বিষয় সম্পর্কিত প্রশ্নের জবাবে স্পষ্ট করেই বলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে আলোচনা চলমান এবং যে কোনো সময় প্রত্যাবাসন শুরু হতে পারে। তবে সুনির্দিষ্ট তারিখ এখনই বলা যাচ্ছে না।

অপর একটি কূটনৈতিক সূত্র জানায়, মূলত গত এক মাস ধরে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন দ্রুত শুরুর ব্যাপারে চীন মিয়ানমারের ওপর চাপ দিতে শুরু করেছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন দেশ ও সংস্থার নানা পদক্ষেপ ও চাপ আগের চেয়ে বেড়েছে। এ অবস্থায় জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের আসন্ন অধিবেশনে এ নিয়ে আরও কঠোর সমালোচনার আগেই মিয়ানমার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরুর একটি বার্তা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দিতে চাচ্ছে। ফলে খুব ছোট আকারে হলেও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু করতে মিয়ানমার খুবই আগ্রহী।

২০১৮ সালের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনেও রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে জোর আলোচনার পর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ বাড়লে মিয়ানমার যে কোনোভাবে রোহিঙ্গা প্রত্যাবসন শুরুর একটা বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তখন পর্যন্ত রাখাইনে মিয়ানমার বাহিনীর দমন-পীড়ন চলছিল এবং প্রত্যাবাসনের জন্য অনুকূল পরিবেশও ছিল না। ফলে প্রত্যাবাসন শুরু সম্ভব হয়নি।

সূত্র আরও জানায়, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে রাখাইনে প্রত্যাবাসনের উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি নিয়ে এখন পর্যন্ত সন্তোষজনক কোনো তথ্য নেই। বরং সেখানে এখনও নানাভাবে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ ভীতিকর পরিবেশ জিইয়ে রেখেছে। এ কারণে রোহিঙ্গারা স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসনে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না। তবে মিয়ানমারের পররাষ্ট্র সচিবের নেতৃত্বে সম্প্রতি প্রথমবারের মতো মিয়ানমার সরকারের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল কক্সবাজার সফর করে ক্যাম্পে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে। এই প্রতিনিধি দল সে সময় বলে, রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার পর ১৯৮২ সালের আইন অনুযায়ী তিন ধাপে নাগরিকত্ব দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

২০১৭ সালে রাখাইন অভিযানে মিয়ানমার বাহিনীর নিষ্ঠুরতায় বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসার পর এটাই ছিল দেশটির কর্তৃপক্ষের নাগরিকত্ব দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রথম প্রতিশ্রুতি। সূত্র জানায়, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে বারবার কফি আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের মাধ্যমে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে মিয়ানমারকে বলা হয়েছে। তবে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ বারবারই সে সুপারিশ পাশ কাটানোর চেষ্টা করেছে।

ওই কমিশনের সুপারিশে রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা, অবাধ চলাচল এবং পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়। এখন আন্তর্জাতিক চাপ আরও বাড়ার মুখে মিয়ানমার সীমিত আকারে রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকার এবং নিরাপত্তার বিষয়টিতে গুরুত্ব দিচ্ছে। এ কারণেই তিন ধাপে নাগরিকত্ব দেওয়ার বিষয়টি তারা সামনে নিয়ে এসেছে।

জুলাইয়ে ঢাকায় বৈঠকেও মিয়ানমারের পররাষ্ট্র সচিব জানান, ১৯৮২ সালের আইন অনুযায়ী মিয়ানমারে তিন ক্যাটাগরির নাগরিকত্ব চালু আছে। কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা ফেরত গেলে এখন প্রথম ধাপে তাদের নারিকত্বের প্রাথমিক স্বীকৃতিস্বরূপ একটি কার্ড দেওয়া হবে। এরপর আইন অনুযায়ী আরও দুটি ধাপ সম্পন্ন করে তিনটি ক্যাটাগরির মধ্যে যে কোনো এক ধরনের নাগরিকত্ব রোহিঙ্গাদের দেওয়া হতে পারে।

ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু নিয়ে বাংলাদেশের প্রস্তুতি রয়েছে। মিয়ানমার চাইলে যে কোনো সময় প্রত্যাবাসন শুরু সম্ভব। তবে সবার আগে রোহিঙ্গাদের সম্মানজনক প্রত্যাবাসন এবং রাখাইনে বসবাসের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে মিয়ানমারকে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিষয়ে দৃশ্যত মিয়ানমারের আগ্রহ আগের চেয়ে যথেষ্ট বাড়লেও রাখাইনে নিরাপদ পরিবেশ কতটা সৃষ্টি হয়েছে সে বিষয়টি মিয়ানমার এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে স্পষ্ট করতে পারেনি। ফলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের সুনির্দিষ্ট তারিখ নিয়ে এ মুহূর্তে বলাও সম্ভব হচ্ছে না।

প্রত্যাবাসন নিয়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে গুজব, আতঙ্ক :টেকনাফ প্রতিনিধি আবদুর রহমান জানান, কক্সবাজারের টেকনাফের ক্যাম্প থেকে রোহিঙ্গাদের জোরপূবর্ক প্রত্যাবাসন করা হবে বলে গুজব আর অপপ্রচার চালাচ্ছে একটি মহল। এ খবরে রোহিঙ্গারা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। রোহিঙ্গাদের মধ্যে কেউ স্বেচ্ছায় ফেরত যেতে চাইলে তার ওপর হামলা হতে পারে বলেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে।

প্রত্যাবাসন নিয়ে গুজব আর অপপ্রচার রোধে ক্যাম্পের নেতাদের সঙ্গে গতকাল রোববার সকালে টেকনাফ উপজেলার হ্নীলা ইউনিয়নের জাদিমোড়া শালবন, লেদা ও নয়াপাড়াসহ বেশ কয়েকটি ক্যাম্পের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে।

বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের সহকারী খালেদ হোসেন ও মোহাম্মদ আরিফুল জামান। তারা দু'জন টেকনাফের নয়াপাড়া ও শালবন রোহিঙ্গা ক্যাম্পের দায়িত্বে রয়েছেন। জানতে চাইলে খালেদ বলেন, 'রোহিঙ্গা নেতাদের সঙ্গে আমরা একটি বৈঠক করেছি। বৈঠকে তাদের বিভিন্ন সমস্যার কথা শুনেছি। বিশেষ করে প্রত্যাবাসন নিয়ে যাতে ক্যাম্পে গুজব, অপপ্রচারের মাধ্যমে মানুষের মাঝে ভয়ভীতি সৃষ্টি না হয়, সেদিকে সর্তক থাকতে বলা হয়েছে।' তিনি আরও বলেন, সরকার জোর করে কাউকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠাবে না, সেটি তাদের জানানো হয়েছে। তাদের যাতে ভালো হয় সরকার সে লক্ষ্যে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

বৈঠকে রোহিঙ্গা নেতা বজলুল ইসলাম ও নুর বশর বলেন, 'হঠাৎ প্রত্যাবাসন নিয়ে রোহিঙ্গারা উদ্বিগ্ন তো বটেই, এমনকি ভয়ভীতির মধ্যে রয়েছে অনেকে, বিষয়টি সেখানে তুলে ধরা হয়েছে। রোহিঙ্গা নেতারা বলেন, যে দেশ থেকে নির্যাতিত হয়ে এসেছি, সেই দেশে কীভাবে যাব! আবারও কি নির্যাতনের শিকার হয়ে ফিরে আসব এ দেশে? প্রত্যাবাসন নিয়ে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে আলোচনা করার দাবি জানান তারা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক রোহিঙ্গা নেতা বলেন, মিয়ানমার সরকার ২০১২ সাল থেকে ১ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গাকে বন্দি করে রেখেছে। তাদের এখনও স্বাধীনতা দেয়নি। এ অবস্থায় এখান থেকে কীভাবে রোহিঙ্গারা যাবে?

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক এনজিও কর্মী বলেন, শালবন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অনেকে বলাবলি করছে, মিয়ানমারে ফেরত যেতে রাজি হলে তাদের ওপর হামলা হতে পারে। ফলে এখানে মানুষের মধ্যে ভয় কাজ করছে।

প্রত্যাবাসনকে কেন্দ্র করে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন র‌্যাব-১৫-এর টেকনাফ ক্যাম্পের ইনচার্জ লে. মির্জা শাহেদ মাহতাব। তিনি জানান, সরকারের নির্দেশে ক্যাম্পে টহল দিয়ে যাচ্ছে র‌্যাব সদস্যরা।

কক্সবাজারে প্রত্যাবাসন টাস্কফোর্সের সভা : কক্সবাজার থেকে আবু তাহের জানান, গতকাল সকালে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সম্পর্কিত টাস্কফোর্সের সভা কক্সবাজারে অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু করতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। প্রত্যাবাসনের জন্য টেকনাফের কেরুনতলী এবং নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম পয়েন্টকে প্রস্তুত রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তারা স্ব স্ব বিভাগের প্রস্তুতি সম্পর্কে সভায় মতামত উপস্থাপন করেছেন।

সংশ্নিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, মিয়ানামারের ছাড়পত্র পাওয়া ৩,৩০০ রোহিঙ্গার একটি তালিকা জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর-এর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। দুই দেশের সঙ্গে ইউএনএইচসিআর-এর এ বিষয়ে চুক্তি রয়েছে। রোহিঙ্গারা স্বেচ্ছায় মিয়ানমারে ফিরতে আগ্রহী কি-না সাক্ষাৎকার গ্রহণের মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত করবেন ইউএনএইচসিআর কর্মকর্তারা। এরপর তাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হবে। টাস্কফোর্সের সভায় একজন কর্মকর্তা অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে প্রশ্ন তুলে বলেন, ইউএনএইচসিআর কর্মকর্তারা সাক্ষাৎকার গ্রহণের নামে রোহিঙ্গাদের ফেরত না যেতে প্রভাবিত করেন। এখন থেকে স্বেচ্ছায় মিয়ানমারে ফেরত যেতে ইচ্ছুক রোহিঙ্গাদের সাক্ষাৎকার গ্রহণের সময় ইউএনএইচসিআর এবং শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার কার্যালয়ের কর্মকর্তারা যৌথভাবে উপস্থিত থাকবেন। সংশ্নিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, যেসব রোহিঙ্গার ছাড়পত্র পাওয়া গেছে, তারা ফিরতে রাজি হলে ৯টি দফায় তাদের ফেরত পাঠানো হবে।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিষয়ে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার আবুল কালাম বলেছেন- 'মন্ত্রণালয় থেকে এখনও চূড়ান্ত কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। তবে প্রত্যাবাসন নিয়ে আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি।' তিনি বলেন, আপাতত সীমান্তের দুটি ট্রানজিট পয়েন্ট কেরুনতলী এবং ঘুমধুমকে প্রস্তুত করা হচ্ছে। সবকিছু চূড়ান্ত হলে দুটি পয়েন্টে প্রত্যাবাসন শুরু করা যাবে। তিনি বলেন, প্রত্যাবাসন নির্ভর করছে রোহিঙ্গাদের আন্তরিক ইচ্ছা এবং মিয়ানমারের রাখাইনে অনুকূল পরিস্থিতির ওপর।

মন্তব্য