| প্রচ্ছদ

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা

যেভাবে বেঁচে গিয়েছিলেন শেখ হাসিনা

পুণ্ড্রকথা ডেস্ক
পঠিত হয়েছে ৩০ বার

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এখন পর্যন্ত নৃশংস সহিংসতার যেসব ঘটনা ঘটেছে ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা তার মধ্যে একটি। দেশের রাজনীতিতে এই ঘটনা গভীর প্রভাব ফেলেছে।

২০০৪ সালের এইদিনে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে শেখ হাসিনার সমাবেশ মঞ্চের তিনদিকে তিন ভাগ হয়ে অবস্থান নেন ১২ জন জঙ্গি। শেখ হাসিনার বক্তব্য শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দলনেতা জান্দাল মঞ্চের সামনে প্রথম গ্রেনেডটি ছোড়েন। 

পরিকল্পনা ছিল, বিস্ফোরণের পর মঞ্চের সামনের জায়গা ফাঁকা হয়ে যাবে। সঙ্গে সঙ্গে কাছাকাছি অবস্থান নেওয়া জঙ্গি বুলবুল গিয়ে সরাসরি মঞ্চে শেখ হাসিনার ওপর গ্রেনেড ছুড়বেন। কিন্তু প্রথম গ্রেনেডটি বিস্ফোরণের পর ঊর্ধ্বশ্বাসে ছোটা মানুষের ধাক্কায় পড়ে যান বুলবুল। উঠে আর গ্রেনেড ছোড়ার সুযোগ পাননি তিনি। এভাবেই প্রাণে বেঁচে যান মঞ্চে থাকা শেখ হাসিনা, সঙ্গে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারাও।

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সাড়ে চার বছরের তদন্ত এবং আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে আসামি মুফতি হান্নান, বুলবুল, জাহাঙ্গীর, বিপুলসহ বিভিন্ন জঙ্গির দেওয়া তথ্য থেকে হামলার এমন চিত্র পাওয়া যায়।

ওই ভয়াবহ হামলায় উগ্র জঙ্গিগোষ্ঠী হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামির (হুজি-বি) ১২ সদস্য সরাসরি অংশ নেন। 

মামলার অভিযোগপত্র, আসামিদের জবানবন্দি ও তদন্ত সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মাঠপর্যায়ে আক্রমণের নেতৃত্বে ছিলেন হুজির দুই কথিত কমান্ডার মুফতি আহসান উল্লাহ ওরফে কাজল ও মুফতি মঈন উদ্দিন শেখ ওরফে আবু জান্দাল। হামলার আগের দিন তারা ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকা পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। 

২০০৫ সালের ১ অক্টোবর গ্রেফতারের পর টিএফআই (টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন) সেলে মুফতি হান্নান জবানবন্দিতে বলেন, পরিকল্পনা অনুযায়ী ২১ আগস্ট সকাল ১০টার মধ্যে হামলার জন্য সংশ্লিষ্টরা রাজধানীর মেরুল বাড্ডায় হান্নানের আস্তানায় জড়ো হন। তাদের মধ্যে ছিলেন কাজল, জান্দাল, আনিসুল মুরসালিন ও তার ভাই মহিবুল মুত্তাকিন, মাওলানা আবু বকর, শাহাদত উল্লাহ ওরফে জুয়েল, উজ্জ্বল ওরফে রতন, মাসুদ, আবুল কালাম আজাদ ওরফে বুলবুল, ইকবাল, জাহাঙ্গীর আলম, মহিবুল ওরফে অভি, রফিকুল ইসলাম ওরফে সবুজ, খলিল, শুভ ওরফে তৌফিক, আরিফ হাসান ওরফে সুমন, বাবু, ফেরদৌস, ও মাওলানা লিটন ওরফে জোবায়ের ওরফে দেলোয়ার।

এদের নিয়ে বৈঠক করেন মুফতি হান্নান, মাওলানা আবু সাইদ ওরফে জাফর, জাহাঙ্গীর আলম ওরফে জাহাঙ্গীর বদর, হাফেজ আবু তাহেরসহ আরও কয়েকজন। আক্রমণের জন্য ১২ জনকে চূড়ান্ত করা হয়। তাদের ১৫টি আর্জেস গ্রেনেড দেওয়া হয়। প্রতি দলে চারজন করে তাদের তিনটি ভাগে ভাগ করে দেওয়া হয়। এর মধ্যে মঞ্চে আক্রমণের দায়িত্ব ছিল জান্দাল, কাজল, বুলবুল ও লিটনের সমন্বয়ে গঠিত দলের। তাদের অবস্থান ছিল মঞ্চের দক্ষিণ-পশ্চিম পাশে।

সবুজ, জাহাঙ্গীর আলম, মাসুদ ও উজ্জ্বলের সমন্বয়ে দ্বিতীয় এবং মুত্তাকিন, মুরসালিন, আরিফ হাসান ও ইকবালের সমন্বয়ে গঠিত তৃতীয় দলটির দায়িত্ব ছিল যথাক্রমে মঞ্চের পশ্চিম ও পশ্চিম-উত্তর দিকে অবস্থান নিয়ে সমাবেশে উপস্থিত জনতার ওপর আক্রমণ করা। 

জঙ্গিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জনতার ওপর আক্রমণের উদ্দেশ্য ছিল নেতাকর্মীরা মঞ্চের দিকে গিয়ে শেখ হাসিনাকে বাঁচানোর চেষ্টা করার সুযোগ যেন না পান।

টিএফআই সেলে দেওয়া জবানবন্দিতে মুফতি হান্নান বলেন, এই ১২ জনের বাইরে আবু বকর, জুয়েল, খলিল, শুভ, বাবু, ফেরদৌসসহ আরও কয়েকজন গোলাপ শাহ মাজারের মসজিদে অবস্থান নেন। 

তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাড্ডায় মুফতি হান্নানের আস্তানায় দুপুরের খাবার খেয়ে আক্রমণের দায়িত্বপ্রাপ্তরা যার যার মতো ঘটনাস্থলের দিকে রওনা হন। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সবাই আসরের নামাজের আগে গোলাপ শাহ মাজার সংলগ্ন পার্কের কোনায় মসজিদে একত্র হন। সেখান থেকে সমাবেশমুখী আওয়ামী লীগের বিভিন্ন মিছিলের সঙ্গে মিশে ১২ জঙ্গি সমাবেশস্থলে গিয়ে হাজির হন।

বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে ট্রাকের ওপর তৈরি সমাবেশ মঞ্চটি ছিল পশ্চিমমুখী। মঞ্চের সামনের দিকে দক্ষিণ পাশে পেট্রল পাম্পের মোড়ের কাছে অবস্থান নেন জান্দাল, কাজল, বুলবুল ও লিটনের দলটি। সবুজ, জাহাঙ্গীর আলম, মাসুদ ও উজ্জ্বলের দ্বিতীয় দলটির অবস্থান ছিল মঞ্চের সামনের দিকে উত্তর পাশের ফুটপাত ঘেঁষে। আর তৃতীয় দলটির অবস্থান ছিল মঞ্চের পশ্চিম পাশে মোড়ের কাছে।

শেখ হাসিনার বক্তব্য শেষ হতেই প্রথম গ্রেনেডটি ছোড়েন জান্দাল। এরপর জঙ্গিরা যার যার অবস্থান থেকে গ্রেনেড ছুড়তে থাকেন। প্রথম গ্রেনেডের পর মঞ্চের সামনের জায়গা ফাঁকা হলে দ্বিতীয় গ্রেনেডটি মারার কথা ছিল বুলবুলের। কিন্তু মানুষের ছোটাছুটির মধ্যে ধাক্কা খেয়ে পড়ে যান বুলবুল। শেষ পর্যন্ত তিনি আর গ্রেনেড ছুড়তে পারেননি। পরে সেফটি পিন না খুলেই গ্রেনেড মাটিতে ফেলে পালিয়ে যান।

আসামি জাহাঙ্গীর আলম জবানবন্দিতে বলেছেন, প্রথম গ্রেনেড হামলার পরপর তিনি মঞ্চের উত্তর পাশ থেকে সমবেত মানুষের ওপর একটি গ্রেনেড ছুড়ে মারেন। সঙ্গে সঙ্গে রক্তাক্ত মানুষের চিৎকার ও ব্যাপক হট্টগোল শুরু হলে তিনি ভড়কে যান। ফলে দ্বিতীয় গ্রেনেডটি না ছুড়ে তিনি জনতার সঙ্গে দৌঁড় দেন এবং গুলিস্তান হকার্স মার্কেটে গিয়ে সেখানকার টয়লেটের ঝুড়িতে বাকি গ্রেনেডটি ফেলে পালিয়ে যান।

জাহাঙ্গীর সিআইডির জিজ্ঞাসাবাদে বলেছেন, পালানোর পথ, কোথায় টয়লেট আছে-এসব আক্রমণের আগেই তারা পর্যবেক্ষণ করেছিলেন।

আসামি বুলবুল জবানবন্দিতে বলেন, তিনি জনতার সঙ্গে মিশে দৌঁড়ে গুলিস্তানের দিকে চলে যান। সেখান থেকে শহর এলাকার একটি বাসে চড়ে গাবতলী যান। গাবতলী থেকে ঝিনাইদহের শৈলকুপায় নিজ বাড়িতে চলে যান ওই রাতেই।

আসামি আরিফ হাসান বলেছেন, তিনি দুটি গ্রেনেড নিক্ষেপ করেছিলেন। একটি বিস্ফোরিত হয়েছে। তড়িঘড়ি করতে গিয়ে দ্বিতীয় গ্রেনেডটির সেফটি পিন না খুলেই নিক্ষেপ করেছিলেন। এরপর তিনি সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে দৌঁড়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন এবং নিউমার্কেটের কাছে গিয়ে মাওলানা তাজউদ্দিনের সঙ্গে দেখা করেন। 

তাজউদ্দিনের কাছ থেকে আট হাজার টাকা নিয়ে তিনি রাজশাহী চলে যান। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছাকাছি একটি ছাত্র মেসে গিয়ে আশ্রয় নেন আরিফ। তাজউদ্দিনই এই ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন বলে জানান তিনি।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শেখ হাসিনাকে হত্যার এই পরিকল্পনা আরও অনেক আগের। হামলার জন্য জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রস্তুত করা হয়েছে অনেক আগে। মুফতি হান্নান, হুজির ডেপুটি চিফ কমান্ডার ঢাকার দোহারের জাহাঙ্গীর বদর ও কাজল (পরে ভারতে নিহত) তাদের প্রশিক্ষণ দেন। 

অভিযোগপত্রের বিবরণ অনুযায়ী, ২০০৪ সালের ১৮ আগস্ট আবু তাহের, মুফতি হান্নান ও আহসান উল্লাহ ওরফে কাজল মোহাম্মদপুর সুপার মার্কেটের কাছে হুজির কার্যালয়ে বৈঠক করেন। বৈঠকে তাহের বলেন, কেন্দ্রীয়ভাবে সিদ্ধান্ত হয়েছে, ২১ আগস্ট শেখ হাসিনার জনসভায় হামলা করা হবে। এ নিয়ে উপমন্ত্রী (তৎকালীন) আবদুস সালাম পিন্টুর সঙ্গেও কথা হয়েছে। 

পরে তদন্তে এসেছে, এসব আর্জেস গ্রেনেড এসেছে পাকিস্তান থেকে। কাশ্মীরভিত্তিক সংগঠন হিজবুল মুজাহিদীনের নেতা আবদুল মাজেদ বাট ওরফে আবু ইউসূফ বাট কিছু গ্রেনেড দিয়েছে মাওলানা তাজউদ্দিনকে। যা দেশের ভেতরে বিভিন্ন হামলায় ব্যবহৃত হয়েছে। 

গ্রেনেড হামলার পর বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তখনকার বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, নেতাকর্মীরা জীবন দিয়ে তার জীবন রক্ষা করেছিলেন। আমার নেতাকর্মীরা সবাই আমাকে এমনভাবে ঘিরে রেখেছিল যে অনেকেই ইনজিউরড (আহত) হয়েছে। তাদের রক্ত এখনও আমার কাপড়ে লেগে আছে। আমার নেতাকর্মীরা তাদের জীবন দিয়েই আমাকে বাঁচিয়েছে।

সেদিনের গ্রেনেড হামলায় ২৪ জন নিহত, আর আহত হন আরও অনেকে।

মন্তব্য