| প্রচ্ছদ

বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথসহ ৮ হাজার কোটি টাকার ৪ প্রকল্পের কাজ শুরু হবে কবে?

পুণ্ড্রকথা রিপোর্ট
পঠিত হয়েছে ৩৭৩ বার। প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ।

বগুড়াসহ এ অঞ্চলে সড়ক ও রেল যোগাযোগসহ ৪টি নদীর নাব্য ফেরাতে নেওয়া প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার বড় ধরনের চারটি প্রকল্প দশ থেকে কুড়ি মাস আগে সরকারের অনুমোদন পেলেও কাজ শুরু হয়নি এখনও। প্রকল্প চারটির মধ্যে তিনটির বাস্তবায়নে খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) অনুমোদন পাওয়া প্রকল্পগুলো হলো-বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত ৮৪ কিলোমিটার রেলপথ স্থাপন, বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে মোহাম্মদ আলী হাসপাতাল পর্যন্ত প্রায় দুুই কিলোমিটার সংযোগ সড়ক নির্মাণ, বগুড়ার নন্দীগ্রামের ওমরপুর থেকে দুপচাঁচিয়ার জিয়ানগর এবং নন্দীগ্রামের কাথম থেকে কালিগঞ্জ পর্যন্ত ৬৫ কিলোমিটার সড়ক প্রশস্থকরণ এবং বগুড়াসহ এ অঞ্চলের ৪ নদীর ২১৭ কিলোমিটার অংশে ড্রেজিং ও তীর সংরক্ষণ। এর মধ্যে প্রথম তিনটি প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
ওই চারটির মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় সাপেক্ষ বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথ স্থাপন প্রকল্পটি প্রায় ১০ মাস আগে ২০১৮ সালের ৩০ অক্টোবর একনেকের অনুমোদন পায়। এর ৮ দিনের মাথায় ৭ নভেম্বর অনুষ্ঠিত একনেকের বৈঠকে গাইবান্ধা, বগুড়া ও সিরাজগঞ্জের মধ্য দিয়ে বয়ে চলা বাঙালি, করতোয়া, ফুলজোড় ও হুরাসাগর নদীর ড্রেজিং ও তীর সংরক্ষণে ২ হাজার ৩৫৫ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। তার আগে ২০১৮ সালের ১১ অক্টোবর অনুমোদন পায় ১৭৯ কোটি টাকা ব্যয় সাপেক্ষ নন্দীগ্রামের ওমরপুর থেকে দুপচাঁচিয়ার জিয়ানগর এবং নন্দীগ্রামের কাথম থেকে কালিগঞ্জ পর্যন্ত সড়ক প্রশস্থকরণ প্রকল্প। আর ১০৫ কোটি টাকা ব্যয় সাপেক্ষ বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ থেকে মোহাম্মদ আলী হাসপাতাল পর্যন্ত সংযোগ সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের অনুমোদন মেলে ২০১৮ সালের ২৩ জানুয়ারি।
দশ থেকে কুড়ি মাস আগে অনুমোদন পাওয়া ওই প্রকল্পগুলোর কাজ কবে নাগাদ শুরু হবে সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দফতরের কর্মকর্তারা নিশ্চিত করে কিছুই বলতে পারছেন না। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) অনুমোদন পাওয়া সত্ত্বেও আমলাতান্ত্রিক নানা জটিলতার কারণে সেগুলোর কাজ দৃশ্যমান করার ব্যাপারে কার্যকর কোন পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি সরকারের অনুমোদন পাওয়ার পরেও প্রকল্পগুলোর কাজ শুরু না হওয়ায় সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা হতাশা প্রকাশ করেছেন। নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের কাজ শুরু হলে ভবিষ্যতে প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধির আশঙ্কা করে তারা বলছেন,বিলম্বিত হওয়ার কারণে ব্যয় বৃদ্ধি পেলে তখন হয়তো প্রকল্পগুলো আর বাস্তবায়িত হবে না শুধু কাগজে-কলমেই পড়ে থাকবে। কাজগুলো দ্রুত শুরু করতে তারা স্থানীয় সংসদ সদস্যদের উদ্যোগী হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রকল্পগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় বগুড়া-সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত রেলপথ স্থাপনের জন্য এখনও পরামর্শক নিয়োগ সম্পন্ন হয়নি। এ কারণে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগসহ দরপত্র আহবানের মত গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমও শুরু করা যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যেহেতু ভারতীয় ঋণে প্রকল্পটি বাস্তবায় করা হবে তাই নিয়ম অনুযায়ী পরামর্শক নিয়োগের বিষয়টি তাদের তরফেই চুড়ান্ত করার কথা। কিন্তু গেল ১১ মাস পেরিয়ে গেলেও প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করা হয়নি। কিছুদিন আগে রেলওয়ের প্রধান কৌশলী মোঃ আফজাল হোসেন এ প্রতিবেদকে জানিয়েছিলেন সব প্রক্রিয়া শেষ করে কাজ শুরু অন্তত দু’ বছর লেগে যাবে।
দ্বিতীয় বড় প্রকল্প এ অঞ্চলের চার নদী-বাঙালি, করতোয়া, ফুলজোড় ও হুরাসগর ড্রেজিং ও তীর সংরক্ষণের কাজ আটকে আটকে আছে দরপত্র আহবান সংক্রান্ত জটিলতার কারণে। ওই প্রকল্পের অন্যতম সমন্বয়কারী পানি উন্নয়ন বোর্ডের বগুড়া বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হাসান মাহমুদ ইতিপূর্বে চলতি বছরের জুন মাসে তীর সংরক্ষণ এবং জুলাই মাসে ড্রেজিংয়ের দরপত্র আহবানের কথা জানিয়ে সেপ্টেম্বর থেকে কাজ শুরু করার কথা জানিয়েছিলেন। তবে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সেই কাজ শুরু করতে না পারার কারণ জানতে চাইলে ওই কর্মকর্তা জুলাই মাসে সৃষ্ট বন্যা পরিস্থিতিকে দায়ী করেন। তার দাবি বন্যা পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে গিয়ে বড় ধরনের ওই প্রকল্পের কোন কাজ এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি। নির্বাহী প্রকৌশলী হাসান মাহমুদ বলেন, ‘তীর সংরক্ষণ প্রকল্পের দরপত্র আগামী সপ্তাহে হতে যাচ্ছে। তবে ড্রেজিংয়ের দরপত্র যেহেতু আন্তর্জাতিকভাবে আহবানের বাধ্যবাধকতা রয়েছে তাই ওই কাজ শুরু হতে আরও কিছু সময় লাগবে।
নন্দীগ্রামের ওমরপুর থেকে দুপচাঁচিয়ার জিয়ানগর এবং নন্দীগ্রামের কাথম থেকে কালিগঞ্জ পর্যন্ত সড়ক প্রশস্থকরণের কাজটিও দরপত্র আহবানের অপেক্ষায় আটকে আছে। আর বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে মোহাম্মদ আলী হাসপাতাল পর্যন্ত সংযোগ সড়ক প্রকল্পটির মেয়াদ এরই মধ্যে শেষ হয়ে গেছে। সড়ক ও জনপথ বিভাগের স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ১ দশমিক ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়ক নির্মাণের জন্য ২০১৮ সালের শুরুতে যখন প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়া তখন এর ব্যয় ধরা হয়েছিল ১০৫ কোটি টাকা। কিন্তু এখন তার ব্যয় আরও ৪৫ কোটি টাকা বেড়ে ১৫০ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, ভূমি অধিগ্রহণ খাতেই প্রয়োজন হচ্ছে ১৩০ কোটি টাকা। তাছাড়া প্রকল্পটির মেয়াদ চলতি বছরের ৩০ জুন শেষ হয়ে গেছে। মেয়াদ শেষ হয়ে যাওার পাশাপাশি ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রকল্পটির পুনর্মূল্যায়ন প্রয়োজন রয়েছে। 
ওই দুই সড়কের কাজ কবে নাগাদ শুরু হবে তা জানতে চাইলে বগুড়া সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আশরাফুজ্জামান বলেন, ‘নন্দীগ্রামের ওমরপুর-জিয়ানগর ও নন্দীগ্রামের কাথম-কালিকগঞ্জ সড়কের জন্য দরপত্র আহবানের প্রস্তুতি চুড়ান্ত পর্যায়ে। খুব শিগগিরই কাজ শুরু হবে। আর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সংযোগ সড়কের ভূমি অধিগ্রহণের জন্য এরই মধ্যে ২৬ কোটি টাকা পাওয়া গেছে। তবে মেয়াদ শেষ এবং ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রকল্পটি আবারও রিভাইজ করতে হবে। এগুলো সম্পন্ন হলেই কাজ শুরু করা হবে।’
অনুমোদন পাওয়ার পরেও বড় ওই চারটি প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়াকে দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেছেন। সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) বগুড়ার সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা মাসুদার রহমান হেলাল। তিনি প্রকল্পগুলোর কাজ দ্রুত শুরু করার ক্ষেত্রে স্থানীয় সংসদ সদস্যদের সংসদের ভেতরে-বাইরে জোরালো ভূমিকা রাখার আহবান জানিয়ে বলেন, ‘বিলম্বমিত হলে ব্যয় বাড়ে আর তখন সরকার প্রকল্প বাস্তবায়নে আগ্রহ দেখায় না। অতীতে বগুড়ায় এ ধরনের বহু প্রকল্প শেষ পর্যন্ত আর বাস্তবায়িত হয়নি। আমরা মনে করি স্থানীয় সাংসদরা যদি একটু তৎপর হন তাহলে প্রকল্পগুলোর কাজ দ্রুত শুরু হবে।’
বগুড়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মাসুদুর রহমান মিলন মনে করেন, প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে শুধু বগুড়াই নয় বরং আশ-পাশের কয়েকটি  জেলার আর্থসামাজিক অবস্থার অনেক উন্নয়ন হবে। প্রকল্পগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন হবে এমন আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ‘যে কোন কিছুর শুরুতে একটু সময় লাগে। কিন্তু বেশি বিলম্ব করা যাবে না। আশাকরি সরকার এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।’

নাগরিক সমাজের দাবি অনুযায়ী একনেকে অনুমোদন পাওয়া ৪টি প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের বিষয়ে সংসদে কোন বক্তব্য উপস্থাপন করবেন কি’না তা জানতে চাওয়া হয়েছিল বগুড়ার দুই সাংসদ আব্দুল মান্নান ও গোলাম মোহাম্মদ সিরাজের কাছে। বগুড়া-১ আসন থেকে নির্বাচিত আওয়ামী লীগ দলীয় সাংসদ আব্দুল মান্নান বলেন, ‘প্রকল্পগুলোর কাজ দ্রুত শুরু করার ব্যাপারে সরকার আন্তরিক। আমি যতদূর জানি প্রকল্পগুলো নিয়ে স্ব স্ব দপ্তর তৎপর রয়েছে। হয়তো সেগুলো দৃশ্যমান হতে আরও কিছুটা সময় লাগবে।’  আর বগুড়া-৬ আসন থেকে নির্বাচিত বিএনপি দলীয় সাংসদ গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ বলেন, ‘ একনেকে পাশ হওয়ার পরেও কেন প্রকল্পগুলোর কাজ শুরু হবে না। আমি অবশ্যই ওই প্রকল্পগুলোর কথা সংসদে তুলবো। কারণ এগুলো শুধু বগুড়ারই নয়, পাশের সিরাজগঞ্জ এবং গাইবান্ধা জেলাসহ এ অঞ্চলের মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত।’
 

মন্তব্য