| প্রচ্ছদ

বগুড়ায় হঠাৎই চুরি বেড়েছেঃ শহরে দিন-দুপুরে আর রাতে গ্রামেঃ লুট হচ্ছে মসজিদের দানবাক্সও

পুণ্ড্রকথা রিপোর্ট
পঠিত হয়েছে ২৭৮ বার। প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০১৮ । আপডেট: ২৫ অক্টোবর ২০১৮ ।

বগুড়ায় চুরির ঘটনা বেড়েই চলেছে। চোরেরা শুধু বাসা-বাড়িতেই নয় মসজিদেও হানা দিচ্ছে এবং দানবাক্সের টাকা-পয়সা লুটে নিচ্ছে। শহর থেকে উপজেলা সদর, বন্দর এমনকি প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে সক্রিয় চোরেরা দিনে-রাতে তালা ভেঙ্গে বাসা-বাড়ি এবং দোকান-পাটে ঢুকে টাকা-পয়সা, স্বর্ণালংকার ও মোটর সাইকেল নিয়ে যাচ্ছে। গ্রামগুলোতে গোয়াল ঘরে রাখা গরুগুলোর দিকেও তাদের নজর পড়েছে। চুরির পাশাপাশি ছিনতাইয়ের ঘটনাও বেড়েছে।
ক্ষতিগ্রস্তদের পক্ষ থেকে নিকটবর্তী পুলিশ ফাঁড়িতে অভিযোগ, থানায় জিডি কিংবা মামলা করা হলেও চুরি-ছিনতাই বন্ধ হচ্ছে না। ধরা পড়ছে না অপরাধীরা এবং উদ্ধার হচ্ছে না লুট হওয়া টাকা কিংবা মালামালা। এতে সাধারণ মানুষ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। উদ্বিগ্ন সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরাও। তারা চুরি ছিনতাই বন্ধে পুলিশকে আরও কঠোর হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তারা বলছেন, চুরি ছিনতাইয়ের প্রতিটি ঘটনাই পুলিশকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করতে হবে। প্রয়োজেন শহরের অভিজাত এলাকার প্রতি মোড়ে সিসি ক্যামেরা লাগানো যেতে পারে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, শহরে অধিকাংশ চুরির ঘটনা ঘটছে দিন-দুপুরে। স্বামী-স্ত্রী এক সঙ্গে চাকরি করেন-এমন ফ্ল্যাট বাড়িতে ভর দুপুরেই চুরির ঘটনা বেশি ঘটছে। অন্যদিকে যেসব স্ত্রী কর্মজীবী নন কিন্তু স্কুল পড়–য়া ছেলে-মেয়েকে নিয়ে প্রতিদিন কোচিংয়ে যান এমন বাড়িগুলোতে চোরেরা ঢুকছে সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টার আগে। আর রাস্তার পাশে পার্কিং করে রাখা মোটর সাইকেল চুরি করা হচ্ছে দিনে-রাতে সুযোগ বুঝে। তবে মসজিদ, দোকান-পাট আর গোয়াল ঘরে হানা দেওয়া হচ্ছে রাধের আঁধারে। একইভাবে ছিনতাইয়ের ঘটনাও ঘটছে গভীর রাতে।
বগুড়া শহরে চুরির ঘটনা সবেচেয় বেশি ঘটেছে পৌরসভার ১১নং ওয়ার্ডভুক্ত মালতিনগর এলাকায়। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, মহল্লার এক প্রান্তে পুলিশ সুপারের সরকারি বাসভবন এবং অপর প্রান্তে একটি পুলিশ ফাঁড়ি থাকা সত্ত্বেও গেল এক মাসে চোরেরা ৬টি বাড়িতে হানা দিয়েছে। এর মধ্যে ৪টি বাড়ি থেকে স্বর্ণালংকারসহ কয়েক লাখ টাকা লুট করেছে। এছাড়া এলাকার তিনটি মসজিদের দান বাক্সও লুট করা হয়েছে। ৩ সেপ্টেম্বর থেকে ১১ অক্টোবরের মধ্যে সংঘটিত ওইসব চুরির প্রতিটি ঘটনা স্থানীয় পুলিশ ফাঁড়ি অবহিত।
থানার রেকর্ড অনুযায়ী ৩ সেপ্টেম্বর মালতিনগর এলাহী মসজিদের পাশে ৪ তলা একটি বিল্ডিংয়ে বসবাসকারী নুরুল ইসলামের ফ্ল্যাট বাড়ি থেকে নগদ ২৫ হাজার টাকা ও স্বর্ণালংকারসহ ১লাখ ৬৩ হাজার টাকা চুরি হয়েছে। ওই ঘটনার পরদিন ৪ সেপ্টেম্বর নুরুল ইসলাম যখন থানায় মামলা করেন তখন সেদিনও ওই একই এলাকায় হাবিবা বেগমের ফ্ল্যাটের ভাড়াটিয়া জহুরুল ইসলামের বাড়ির তালা ভেঙ্গে নগদ ৪০ হাজার টাকা এবং প্রায় আড়াই ভরি স্বর্ণালংকার চুরি করা হয়। তবে জহুরুল ইসলাম থানায় কোন মামলা করেন নি। কারণ জানতে চাইলে তিনি উল্টো এ প্রতিবেদকে প্রশ্ন করেন, ‘মামলা করে কি হবে?’
এর পর ২ অক্টোবর দুপুরের দিকে চোরেরা মালতিনগর পূজা ম-পের পাশে সুজনের বিল্ডিংয়ে তৃতীয় তলায় তিনটি ফ্ল্যাটে হানা দেয়। তবে দু’টির তালা ভাঙতে না পারলেও সোহেল নামে এক ব্যক্তির ফ্ল্যাটের দরজার তালা ভেঙ্গে ঢুকে ৪ হাজার টাকা ও মোবাইল ফোন নিয়ে যায়। পরদিন পাশের বকশিবাজার এলাকায় প্রবাসী রুমির বিল্ডিংয়ে শাহীন এবং রেহেনা বেগম নামে দুই ভাড়াটিয়ার ফ্ল্যাট থেকে টাকা ও স্বর্ণালংকার লুট করা হয়।
অভিযুক্তরা ধরা ছোঁয়ার বাইরে থেকে যাওয়ায় প্রায় এক মাসের মাথায় ১১ অক্টোবর চোরেরা ওই বাড়ির পাশের এলাহী মসজিদের কলাপসিবল গেটের তালা ভেঙ্গে ভেতরে ঢুকে দানবাক্স ভেঙ্গে টাকা-পয়সা লুট করে। একইভাবে ওই এলাকার আনসার ক্লাব সংলগ্ন লিল্লাহ্্ মসজিদ এবং পুলিশ ফাঁড়ির কাছাকাছি মাটির মসজিদেরও দান বাক্স ভেঙ্গে টাকা-পয়সা লুট করা হয়েছে।
ওই এলাকার ওয়ার্ড কাউন্সিলর সিপার আল বখতিয়ার জানান, স্থানীয় একদল মাদক সেবী এসব চুরির ঘটনায় সম্পৃক্ত। তিনি বলেন, ‘বাসা-বাড়িতে চুরি করছে এ ধরনের ৮জন মাদক সেবীর নাম আমি পুলিশকে দিয়েছি। তাদের গ্রেফতার করলেই চুরি বন্ধ হয়ে যাবে। মালতিনগরে অবস্থিত বনানী পুলিশ ফাঁড়ির সাব ইন্সপেক্টর সাজেদুর রহমান জানান, তারা চোরদের গ্রেফতারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘একটি মসজিদে সিসি টিভির ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে সেখান থেকে চোরদের সনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।’
শহরে অন্যান্য মহল্লা থেকেও চুরি ও ছিনতাইয়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব নিয়ে স্থানীয় পত্রপত্রিকায় একাধিক রিপোর্টও প্রকাশিত হয়েছে। বিশেষ করে পূর্ব বগুড়ার চেলোপাড়া ও সাবগ্রাম এলাকায় গভীর রাতে ছিনতাইকারীদের তৎপরতা বেড়ে যায়। স্থানীয়দের অভিযোগ ছিনতাইকারীদের ৪টি গ্রুপ সেখানে সক্রিয় রয়েছে। অন্যদিকে জেলার শিবগঞ্জ উপজেলা সদর ও মহাস্থান বন্দরের দোকান-পাট এবং প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে বসত-বাড়ি থেকে গেল ১০ দিনে ৬টি মোটর সাইকেল, স্বর্ণালংকার এবং ৯টি গরুসহ প্রায় ১৫ লাখ টাকার মালামাল চুরি হয়েছে। শিবগঞ্জ থানার ওসি মিজানুর রহমান জানান, তারা অভিযুক্তদের আইনের আওতায় আনার মাধ্যমে চুরি বন্ধের উদ্যোগ নিয়েছেন।
বগুড়ায় সুশাসনের জন্য প্রচারাভিযানের (সুপ্র) সাধারণ সম্পাদক কেজিএম ফারুক বলেন, ‘হঠাৎ করেই শহরে যেন চুরির ঘটনা বেড়েছে। এটা বন্ধ করতে হলে পুলিশকে কঠোর হতে হবে। প্রতিটি ঘটনাই গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করতে হবে। প্রয়োজনে শহরের প্রতিটি অভিজাত এলাকার মোড়গুলোতে সিসি ক্যামেরা সংযোজন করা যেতে পারে।’
বগুড়া সদর থানার ওসি (তদন্ত) কামরুজ্জমান চুরি বন্ধে পুলিশ সব সময় সোচ্চার রয়েছে জানিয়ে বলেন, ‘আমরা বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করেছি এবং অভিযান অব্যাহত রয়েছে।’ তবে তিনি বাসা-বাড়ির মালিক ও ভাড়াটিয়াদের বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনেরও পরামর্শ দিয়েছেন।

মন্তব্য