| প্রচ্ছদ

খোলা আকাশের নিচে রাত্রিযাপন, নেই পুনর্বাসনে দৃশ্যমান উদ্যোগ

পুণ্ড্রকথা ডেস্ক
পঠিত হয়েছে ২৫ বার। প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ।

ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে যাওয়া মিরপুর-৬ ঝিলপাড় বস্তির (চলন্তিকা বস্তি) বাসিন্দাদের ঠাঁই এখন খোলা আকাশের নিচে। গত ১৬ আগস্ট (শুক্রবার) রাতে অগ্নিকাণ্ডে সব হারিয়ে দিশেহারা বস্তিবাসীদের এখন মাথা গোজার জায়গা নেই। কেউ খোলা আকাশের নিচে, কেউ অন্যের বাড়িতে, কেউবা রিকশা-ভ্যানেই রাত্রিযাপন করছেন।

মঙ্গলবার (১৭ সেপ্টেম্বর) দুপুরে বস্তিতে ঢোকার মুখে মূল সড়কে দেখা যায় মানুষের জটলা। প্রখর রোদে খোলা আকাশের নিচে যেখানে বসা দায় সেখানে কোনো উপায়ান্তর না পেয়ে ত্রাণের জন্য অপেক্ষা করছেন তারা। যদি কোনো নেতা, এনজিও কিংবা সিটি কর্পোরেশনের কর্তারা ত্রাণ নিয়ে আসেন -এমন আশায়।

জটলার কাছে গিয়ে কথা বলতে চাইতেই আরও অনেকে ভিড় করেন। অনেকের শুকনো মুখে হাসি ফুটে। এই বুঝি ত্রাণের জন্য তালিকাভুক্তি করা হচ্ছে। সবাই নিজ নিজ নাম ঠিকানা দিতে ব্যস্ত হয়ে ওঠেন। তবে সাংবাদিক পরিচয় জানার পর অনেকেরই মন খারাপ হয়।

শাহনুর নামে এক নারী বলেন, ‘অনেক তো লিখতাছেন, কিন্তু এক মাসেও তো থাকনের (থাকার) জায়গাটাই পাইলাম না। খাওনের দুশ্চিন্তা নিয়ে ঘুরিফিরি, কাজ-কামও পাই না। আমগো তো মানুষই মনে করে না সরকার।’

উপস্থিত অধিকাংশের অভিযোগ, সরকার নাকি আগুনে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করবে। কিন্তু বাস্তবে কোনো খবরই নেই। জানা যায়, অগ্নিকাণ্ডের পর কিছু চাল, খেজুর ও তাবু দেয়া হয়েছে। তবে পুনর্বাসন আশ্বাসেই থেমে আছে।

আগুনের রাতে ফায়ার সার্ভিসের সাথে কাজ করতে গিয়ে পা ও কোমড়ের হাড় ভেঙে পঙ্গুপ্রায় রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘সরকার ১০ লক্ষাধিক রোহিঙ্গার জন্য বাংলাদেশে থাকা-খাওনের ব্যবস্থা করছে। অথচ আমরা যারা বাংলাদেশি, ঘরবাড়ি হারা, বস্তিতে একটু ঠাঁই মিলছিল। হঠাৎ আগুনে সব হারিয়ে এখন আমরা খোলা আকাশের বাসিন্দা। শুরুতে কিছু চাল-ডাল, খেজুর মিললেও এখন আর কেউ আসে না, খোঁজ রাখে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের তো বিশেষ কোনো চাওয়া ছিল না। আমরা থেকে-খেয়ে খারাপ ছিলাম না। আমাদের থাকার জায়গাটা হলেই অনেকেই কিছু একটা করে আবার গুছিয়ে নিতে পারবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত শুধু আশ্বাসই পেলাম।’

তাসলিমা, নীরু বেগম, ওসুমান বেগম, ছলি বেগম, রিজিয়া বেগম, আয়শা, সালমা, মালেকা, জহুরা, শাহনাজ, মনিরা বেগমসহ অসংখ্য নারী ছলছল চোখ নিয়ে শুধু থাকার জায়গার কথা বার বার বলছিলেন।

ওই বস্তিতে বসবাস করা নাছিমা বেগম বলেন, ‘বস্তির মধ্যে ঝিলের ওপরে বাঁশের মাচার দিয়ে তৈরি দুটি ঘর ছিল, কিন্তু কিচ্ছু আনতে পারি নাই। এক কাপড়ে ঘর থাইক্কা বাহির হইয়া আইছি। আজকে এক মাস ১ দিন যাইতাছে। ঘর নাই। থাকনের জায়গা নাই।’

পুড়ে যাওয়া ঝিলপাড় বস্তি ঘুরে দেখা যায়, পুরো বস্তি যেন বড় একটি ধ্বংসস্তূপ। সেই ধ্বংসস্তূপে অবশিষ্ট বলতে মাচার লোহার খুঁটি, পাকা ঘরের সিঁড়ি, পুড়ে কালো হয়ে যাওয়া তেঁতুল ও মেহগনী গাছ। আগুনে পুড়ে গাছগুলোও মৃতাপ্রায়। তবে আগুনের থাবা থেকে বেঁচে যাওয়া মূল বস্তির পাশে
দু-চারটি ঘরে বাসিন্দার দেখা মিলে।

আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত ঝিলপাড় বস্তিবাসীকে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছিলেন ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র আতিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, ইতোমধ্যে তাদের পুনর্বাসনের জন্য বাউনিয়া বাঁধে কাজ শুরু হয়েছে। এখানকার ১০ হাজার পরিবারকে পর্যায়ক্রমে সেখানে স্থানান্তর করা হবে।

ডিএনসিসির মিরপুর-৬ নম্বর ওয়ার্ড কমিশনার হাজী রজ্জব হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘ঝিলপাড় বস্তিতে অনেক লোকের বসবাস। আগুনে ১০ হাজারের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বস্তির সব বাসিন্দা এখানকার ভোটার নন। এ বস্তিতে ৫ হাজারের মতো স্থানীয় ভোটার রয়েছেন। অগ্নিকাণ্ডে দুই হাজার স্থানীয় ভোটার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাদের পুনর্বাসনের কাজ চলছে।’

তিনি বলেন, ‘এখন পর্যন্ত যে সিদ্ধান্ত তাতে, যাদের জাতীয় পরিচয়পত্রে স্থায়ী/অস্থায়ী ঠিকানায় ‘বস্তি’ লেখা আছে তাদেরকেই বাউনিয়া বাঁধে পুনর্বাসনের সুযোগ দেয়া হবে। আমরা আগুনের পর স্থানীয় স্কুল-কলেজে ক্ষতিগ্রস্থদের থাকা-খাওনের ব্যবস্থা করেছিলাম। স্কুল-কলেজ খোলার পর আরও সপ্তাহখানেক চলছে। এখন আর সম্ভব হচ্ছে না। কারণ সব স্কুল কলেজ খুলে গেছে।’

ডিএনসিসির বস্তি উন্নয়ন কর্মকর্তা মো. আনোয়ার হোসেন ভূঞা জাগো নিউজকে বলেন, পুনর্বাসনের জন্য জেলা প্রশাসন থেকে ২ হাজার পরিবারকে ৩০ কেজি করে চাল দেয়া হয়েছে। প্রায় ১০ দিন পানি ও স্যানিটেশনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। পরবর্তিতে ত্রাণ হিসেবে ৭ হাজার করে টাকা ও ১০ বালতি করে হাইজেনিক খাবার সরবরাহ করা হয়েছে। আর ক্ষতিগ্রস্তদের থাকার ব্যবস্থা জেলা প্রশাসক কিংবা স্থানীয় সাংসদদের করার দায়িত্ব।

এদিকে অগ্নিকাণ্ডের একমাস কেটে গেলেও মিরপুর-৬ ঝিলপাড় বস্তিবাসীদের পুনর্বাসনে বাউনিয়া বাঁধে তেমন কোনো কার্যক্রমের অগ্রগতি চোখে পড়েনি। এছাড়া কোন প্রক্রিয়ায় সেখানে বস্তিবাসীদের জায়গা বা ঘর বরাদ্দ দেয়া হয়ে সে বিষয়েও বস্তিবাসীরা কিছু জানেন না বলে জানান।

সম্প্রতি সংসদ ভবনে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির ৫ম বৈঠকেও মিরপুর-৬ ঝিলপাড় বস্তির অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতির বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়, ঝিলপাড় বস্তিতে আগুনে ২ হাজার ২৪৮টি ঘর, ১ হাজার ৯৮৮টি পরিবার এবং ৬ হাজার ৭৫৪ জন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

 

মন্তব্য