| প্রচ্ছদ

আজ শব-ই বরাত: মুসলিমদের করণীয়

আমিনুর রহমান
পঠিত হয়েছে ৩০৭ বার। প্রকাশ: ০১ মে ২০১৮ । আপডেট: ০১ মে ২০১৮ ।

আজ মহিমান্বিত সেই চৌদ্দই শাবান। পবিত্র হাদিস শরীফে আজকের দিবাগত রাতকে বলা হয়েছে ‘লাইলাতুন নিছফি মিন শাবান’। যার অর্থ শাবান মাসের মধ্যবর্তী রাত। ফার্সি ভাষায় এ রাতের নামকরণ করা হয়েছে ‘শব-ই বরাত’ বা সৌভাগ্যের রজনী।
ভারত উপমহাদেশ দীর্ঘ সময় মুঘল সা¤্রাজ্যের অধীনে থাকায় এ অঞ্চলে তাদের ব্যবহৃত ফার্সি ভাষার অধিক প্রচলন দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে ইসলামি পরিভাষাগুলো আরবির চেয়ে ফার্সিতেই বেশি জনপ্রিয়তা পায়। সেই ধারাবাহিকতায় আজকের এই দিনটির নামকরণও আরবি লাইলাতুন নিছফি মিন শাবান-এর চেয়ে ফার্সি ভাষায় শব-ই বরাতই বেশি পরিচিতি পেয়েছে। ঠিক একইভাবে আরবি ‘সালাত’ কে আমরা খুঁজে পাই ফার্সি ‘নামাজ’ এবং ‘সিয়াম’ কে পাওয়া যায় ‘রোজা’র মধ্যে।
লাইলাতুন নিছফি মিন শাবান বা শব-ই বরাত সম্পর্কে পবিত্র কোরআন শরীফে স্পষ্ট কোন বর্ণনা পাওয়া যায় না। তবে তাফসিরকারকগণ পবিত্র কোরআন শরীফের পঁচিশ পারায় ৪৪ নম্বর সূরার (সূরা দুখান) তিন এবং চার নম্বর আয়াতকে নিছফি মিন শাবান বা শব-ই বরাতের ইঙ্গিত বলে মত দিয়েছেন। সূরা দুখানের ৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘ইন্না আনযানলা-হু ফি লাইলাতিম্ মুবারাকাতিন্ ইন্না কুন্না মুনযিরীন।’ অর্থঃ ‘নিশ্চয় আমি অবতীর্ণ করেছি (কোরআন) এক মুবারক (কল্যাণময়) রজনীতে। নিশ্চয় আমি সতর্ককারী।’ ৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘ফীহা ইউফরাকু কুল্লু আমরিন হাকিম।’ অর্থঃ ‘এ রজনীতে প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ কাজের ফয়সালা করা হয়।’
তবে অনেকে ওই দু’টি আয়তকে ‘শব-ই ক্বদর’-এর রাত সম্পর্কে বলা হয়েছে-এমন অভিমত ব্যক্ত করেছেন। এর কারণ হিসেবে তারা সূরা কদর-এর প্রথম আয়াতের [ইন্না আনযানলা-হু ফি লাইলাতিল ক্বাদরি। অর্থঃ নিশ্চয় আমি ক্বদরের সম্মানিত রাতে কোরআন অবতীর্ণ করেছি] উদাহরণ তুলে ধরেন।
কিন্তু যারা সুরা দুখানের ওই দু’টি আয়াতকে শব-ই বরাতের জন্য ইঙ্গিতপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন তাদের বক্তব্য হলো মহান রাব্বুল আলামীন শব-ই বরাতের রাতে কোরআন নাজিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং ক্বদরের রাত্রিতে তা নাজিল করেছেন। ওই দু’টি আয়াত যে শব-ই বরাতকেই বোঝানো হয়েছে সে সম্পর্কে প্রমাণ দিতে গিয়ে ইসলামি মাসলা-মাসায়েল বিষয়ক পত্রিকা ‘মাসিক মদীনা’র প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক মরহুম মুহিউদ্দিন খান পবিত্র কোরআন শরীফের অনেক গাণিতিক ব্যাখ্যার আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি সূরা দুখানকে পবিত্র কোরআনের ৪৪ নম্বর সূরা উল্লেখ করে বলেছেন ৪৪ সংখ্যার মধ্যে ৪+৪=৮ পাওয়া যায়। আর শাবান হলো হিজরি সনের অষ্টম মাস। তাই সুরা দুখানের ওই দু’টি আয়াতের মাধ্যমে শব-ই বরাতকেই বুঝানো হয়েছে।
শব-ই বরাত বা লাইলাতুন নিছফি মিন শাবান সম্পর্কে হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রাঃ), হযরত আলী (রাঃ) হযরত আয়েশা সিদ্দিকাসহ (রাঃ) অন্তত ১২জন সাহাবায়ে কেরামের বর্ণনা ভিত্তিক হাদীস পাওয়া যায়। বগুড়া কেন্দ্রীয় বড় মসজিদের খতিব হযরত মোঃ আজগর আলী গত শুক্রবার শব-ই বরাতের দলিল বর্ণনা করতে গিয়ে মিশকাত শরীফের ১১৫ নম্বর পাতায় বর্ণিত একটি হাদীসের কথা তুলে ধরেছেন। সেখানে হযরত আয়েশা সিদ্দিকার (রাঃ) উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, তিনি বলেন, “একদা আল্লাহ্ পাকের হাবিব হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে কোন এক রাত্রিতে রাত যাপন করছিলাম। এক সময় উনাকে বিছানায় না পেয়ে আমি মনে করলাম যে, তিনি হয়তো অন্য কোন আহলিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা-এর হুজরা শরীফে তাশরীফ নিয়েছেন। অতঃপর আমি তালাশ করে উনাকে জান্নাতুল বাক্বীতে পেলাম। সেখানে তিনি উম্মতের জন্য আল্লাহ্ পাকের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছেন। এ অবস্থা দেখে আমি স্বীয় হুজরা শরীফে ফিরে এলে তিনিও ফিরে এলেন এবং বললেলন, ‘আপনি কি মনে করেন আল্লাহ্ পাকের হাবিব হুযুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আপনার সাথে আমানতের খিয়ানত করেছেন?’ আমি বললাম, ‘ইয়া রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমি ধারণা করেছিলাম যে, আপনি হয়তো আপনার অন্য কোন আহলিয়ার হুজরা শরীফে তাশরীফ নিয়েছেন।’ অতঃপর হুযুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ্ পাক শাবানের ১৫ তারিখ রাত্রিতে পৃথিবীর আকাশে অবতরণ করেন অর্থাৎ রহমতে খাছ নাযিল করেন। অতঃপর তিনি বণী কালবের মেষের গায়ে যত পশম রয়েছে তার চেয়ে বেশি সংখ্যক বান্দাকে ক্ষমা করে থাকেন।’ [সূত্র: সুনানে তিরমিযি ২/১২১,১২২ (মুসাদে আহমাদ ৬/২৩৮) ইবনে মাযাহ, রযীন, মিশকাত শরীফ]”
মাওলানা মোঃ আজগর আলী আরও কয়েকটি হাদীস শরীফের বর্ণনা উল্লেখ করে বলেন, রাসুল (সাঃ) শব-ই বরাতের রাতে বেশি বেশি ইবাদত এবং পরদিন নফল রোজার রাখতে বলেছেন। শুক্বার জুম’আর বাংলা খুৎবায় খতিব মোঃ আজগর আলী আরও কয়েকটি প্রসিদ্ধ গ্রন্থের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন যে, শব-ই বরাতের রাত্রিতে আল্লাহ্ পাক সুদখোর, জেনাকারী, ব্যাভিচারিনী, মা-বাবাকে কষ্ট দেয়-এমন আরও দশ ধরনের মানুষ ছাড়া সকলকেই ক্ষমা করবেন। পরিশেষে তিনি উপস্থিত প্রত্যেক মুসল্লীকে শব-ই বরাতের রাতে নফল নামাজ, পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত এবং বাবা-মাসহ যারা কবরবাসী হয়েছেন তাদের জন্য দোয়া করার অনুরোধ করেন।

মন্তব্য