| প্রচ্ছদ

নুসরাত হত্যা মামলার রায় ২৪ অক্টোবর

পুণ্ড্রকথা ডেস্ক
পঠিত হয়েছে ১৭ বার। প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ।

সোনাগাজীর আলোচিত মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলার বিচার কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়েছে। আগামী ২৪ অক্টোবর এ মামলার রায় ঘোষণা করবেন আদালত।

সোমবার ১৫ আসামীর উপস্থিতিতে রায়ের তারিখ নির্ধারণ করেন ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশিদ। বিচার কাজ শুরুর ৬১ কার্য দিবসের পর মামলাটি রায় ঘোষণার তারিখ নির্ধারিত হলো। খবর সমকাল অনলাইন 

এ দিন দুপুরে মামলার বিচার কাজ শুরু হলে বাদী পক্ষের আইনজীবী আক্রামুজ্জামান ইতিপূর্বে আদালতে আসামী পক্ষের আইনজীবীদের উপস্থাপিত যুক্তিতর্কের বিপক্ষে আইনি ব্যাখ্যা তুলে ধরে আদালতে বক্তব্য দেন। তার বক্তব্য প্রদানের সময় আসামী পক্ষের আইনজীবীরা একযোগে দাড়িয়ে আইনি ব্যাখ্যার বাইরে যুক্তি তুলে ধরার কারণ দেখিয়ে প্রতিবাদ জানান। এসময় উভয় পক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে তুমুল হট্টগোল চলে। পরে আদালতের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হয়। এরপর বাদী পক্ষের আইনজীবী শাহজাহান সাজু আইনি ব্যাখ্যা তুলে ধরেন। সর্বশেষ রাষ্ট্রপক্ষের পিপি হাফেজ আহাম্মদ আসামী পক্ষের যুক্তিতর্ক খন্ডন করে আদালতে বক্ত্য দেন।

তিন আইনজীবী আসামী পক্ষের যুক্তিতর্ক খন্ডন করে বলেন, নুসরাত কে আসামীরা পরস্পর যোগসাজসে কেরোসিন তেল ঢেলে আগুন লাগিেেয় হত্যা করেছে, দুইজন প্রত্যাক্ষদর্শী সাক্ষীসহ অপর সাক্ষীরা আদালতে হত্যার স্বপক্ষে সাক্ষ্য দিয়েছে, আসামীরা নিজেদের জড়িয়ে স্বেচ্ছায় জবানবন্দি দিয়ে হত্যার দায় স্বীকার করেছে, তাদেরকে রিমান্ডে কোনো প্রকার নির্যাতন করা হয়নি। এসময় তারা উচ্চ আদালতে বিভিন্ন রেফারেন্স তুলে ধরে আদালতের কাছে আসামীদের সর্বোচ্চ শাস্তি প্রার্থনা করেন।

দুপুরের খাবারের বিরতির পর আসামী পক্ষের আইনজীবী কামরুল হাসান, গিয়াস উদ্দিন নান্নু রাষ্ট্র ও বাদী পক্ষের আইনজীবীদের ব্যাখ্যা খন্ডন করে তাদের যুক্তি উপস্থাপন করেন। তারা বলেন, নুসরাত আত্মহত্যা করেছে, যা ময়না তদন্তকারী ডাক্তার সোহেল মাহমুদের আদালতে সাক্ষ্য থেকে প্রমাণিত হয়। রাষ্ট্রপক্ষ এ মামলায় একজন প্রত্যাক্ষদর্শী আাদলতে হাজির করতে পারেনি, জজ মিয়াকে নির্যাতন করে যেভাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টার মিথ্যা স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়েছে ঠিক একইভাবে পিবিআই নির্যাতন করে মিথ্যা স্বীকারোক্তি আদায় করেন। আসামীরা নির্দোষ জানিয়ে আদালতের কাছে ন্যায় বিচার প্রত্যাশা করেন। আসামী সিরাজ উদদৌলার আইনজীবী ফরিদুল ইসলাম নয়ন পিবিআই প্রধান বনজ কুমার মজুমদারের গত ১৩ এপ্রিল ও ২৮ মে ঢাকা পিবিআই সদর দপ্তরে সংবাদ সম্মেলনের ভিডিও ফুটেজসহ লিখিত আবেদন আদালতে জমা দিয়ে বলেন, আসামী শামিম ও নুরউদ্দিন পিবিআই হেফাজতে থাকার সময় বনজ কুমার মজুমদার সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন- তারা অপরাধ স্বীকার করেছেন, এ ঘটনায় আরো ১৩ জন জড়িত আছে। আসামীদের আদালতে হস্তান্তর না করে তিনি সোনাগাজীর প্রভাবশালী মহলের সাথে যোগসাজস করে অসৎ উদ্দেশ্যে আসামীরা স্বীকার করেছে বলে মিডিয়ার সামনে বক্তব্য প্রদান করেন। আদালতে অভিযোগপত্র দাখিলের দুই দিন আগে ২৮ মে বনজ কুমার মজুমদার সংবাদ সম্মেলন করে আসামীরা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে কে কি বলেছে তা প্রায় হুবুহু বলে দেন। মামলার গোপনীয় দলিল তিনি আদালতে জমা দেওয়ার আগে  আইনগত কারনে প্রকাশ করতে পারে না। তার এসব কর্মকাণ্ডে প্রমাণ হয়- তার নির্দেশে তদন্তকারী কর্মকর্তা স্বীকারোক্তি আদায়ের নামে জজ মিয়া নাটক করে নিরাপরাধ লোকদের ফাঁসিয়ে দেন।

রাষ্ট্র ও আসামী পক্ষের পাল্টাপাল্টি যুক্তি খন্ডনের পর বিচারক মামুনুর রশিদ উভয় পক্ষকে আশ্বস্ত করে বলেন, সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে ন্যায় বিচার করা হবে। এ সময় কাঠগড়ায় থাকা আসামীরা কান্নাজনিত কন্ঠে বিচারককে আল্লাহর প্রতিনিধি বলে ন্যায় বিচার কামনা করেন।

গত ২৯ মে ১৬ জনকে অভিযুক্ত করে ফেনীর সিনিয়র জুড়িশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে ৮০৮ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্র দাখিল করে পিবিআই। ৩০ মে ১৬ আসামীর উপস্থিতিতে বিচারক জাকির হোসেন অভিযোগপত্র গ্রহণ করে মামলাটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর আদেশ দেন। ওই দিন আদালতে আসামীরা নিজেদের নির্দোষ দাবী করে পিবিআই নির্যাতন করে স্বীকারোক্তি আদায় করেছে অভিযোগ তোলে আদালতে উপস্থিত থাকা মামলার বাদী মাহমুদুল হাসান নোমান ও তার আইনজীবী রফিকুল ইসলাম খোকনকে লক্ষ্য চিৎকার করেন।

এ মামলায় অভিযোগপত্রে অন্তভুক্ত ১৬ আসামির মধ্যে ১২ জন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে তবে বিচারিক আদালতে আসামীরা নির্যাতন করে জবানবন্দি গ্রহন করা হয়েছে উল্লেখ করে স্বীকারোক্তি প্রত্যাহারের আবেদন করেন।

১০ জুন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল অভিযোগপত্র আমলে নিলে মামলার পরবর্তী কার্যক্রম শুরু হয়। ২০ জুন অভিযুক্ত ১৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচারিক আদালত। ২৭ জুন মামলার বাদী নুসরাতের ভাই মাহমুদুল হাসান নোমানেরর সাক্ষ্য প্রদানের মাধ্যমে মামলার বিচার কাজ শুরু হয়ে সরকারি বন্ধ ছাড়া প্রতি কার্য দিবসে বিচার কাজ চলে। মামলার ৯২ জন সাক্ষীর মধ্যে ৮৭ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করেন আদালত।

বিচার কাজ চলাকালে আদালতে নুসরাতের মৃত্যুকালীন জবানবন্দির ভিডিও প্রদর্শন করা হয় ও আসামী শাহাদাত হোসেন শামিমের সাথে আসামী রুহুল আমিন ও শাখাওয়াত হোসেন জাবেদের কথোকপথনের অডিও রেকর্ড শোনানো হয়। আসামী পক্ষের আইনজীবীরা পিবিআই প্রধান বনজ কুমার মজুমদারকে আদালতে তলবের আবেদন করলেও বিচারক না মঞ্জুর করেন। মামলার বাদী নোমান ও সোনাগাজী পৌর মেয়র রফিকুল ইসলাম খোকনের কথোকপথনের রেকর্ড তলবের আসামী পক্ষের আবেদন আদালত মঞ্জুর করলে বিটিআরসির দুই কর্মকর্তা স্বশরীরে উপস্থিত হয়ে সেগুলো আদালতে হস্তান্তর করেন। বিচার চলাকালে আসামী পক্ষের আইনজীবীরা গত ৬ এপ্রিল নুসরাতের অগ্নিদগ্ধের দিন সোনাগাজী পৌরসভা ও মডেল থানার সিসিটিভি ফুটেজ তলবের আবেদন করেন। আবেদন মঞ্জুর করলেও সংরক্ষণ করা হয়নি জানিয়ে মডেল থানা কর্তৃপক্ষ সিসিটিভি ফুটেজ আদালতে জমা দিতে পারেনি। মামলার অভিযোগপত্রে উল্লেখিত ফেনী জেলা কারাগারের সাক্ষাতকার কক্ষ, সোনাগাজী মাদ্রাসার ঘটনাস্থল ও বোরকা উদ্ধারের ডাঙ্গিখাল বিচারকের সরাসরি পরিদর্শনের আসামী পক্ষের আবেদন গ্রহণ করলেও আদালত সে বিষয়ে কোন আদেশ প্রদান না করে রায়ের তারিখ নির্ধারণ করেন। এ মামলায় ৩৪২ ধারায় আত্মপক্ষ সমর্থনের সময় আসামীরা নিজেদের নির্দোষ দাবী করে সাফাই সাক্ষী দিবে না বলে জানায়। বিচার চলাকালে মামলার উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলোর মাঝে অন্যতম হলো- আসামী উপজেলা আওয়ামীলীগ সভাপতি রুহুল আমিনের বিরুদ্ধে বাদী নুসরাতের ভাই নোমান, তার মা, বাবা অপর ভাই রায়হান সহ ৮৭ জন সাক্ষীর কেউ সাক্ষ্য প্রদান করেননি।

পুরো বিচার প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপক্ষে পিপি হাফেজ আহমদ, বাদী পক্ষে শাহজাহান সাজু, আক্রামুজ্জামান, সালাউদ্দিন শিমুল ও আসামী পক্ষের ঢাকা বারের এহসানুল হক সমাজি, ফারুক আহমদ, গিয়াস উদ্দিন নান্নু, কামরুল হাসান, মাজফুজুল হক, আহসান কবির বেঙ্গল, ফরিদ উদ্দিন নয়ন আইনজীবী হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন।

উল্লেখ্য, সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার আলিম পরীক্ষার্থী ছিলেন নুসরাত। ওই মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলার বিরুদ্ধে তিনি যৌন হয়রানির অভিযোগ করেন। এই ঘটনায় নুসরাতের মা শিরিন আক্তার বাদী হয়ে ২৭ মার্চ সোনাগাজী থানায় মামলা দায়ের করেন। এরপর অধ্যক্ষকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরে মামলা তুলে নিতে বিভিন্নভাবে নুসরাতের পরিবারকে হুমকি দেয়া হয়। ৬ এপ্রিল সকাল পৌনে ১০টার দিকে আলিম পর্যায়ের আরবি প্রথম পত্রের পরীক্ষা দিতে ওই মাদ্রাসার কেন্দ্রে যান নুসরাত। এসময় তাকে পাশের বহুতল ভবনের ছাদে ডেকে নিয়ে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন দেয়া হয়। ১০ এপ্রিল রাত সাড়ে ৯টায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে নুসরাত মারা যান। এই ঘটনায় নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান বাদী হয়ে ৮ এপ্রিল সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা দায়ের করেন।

মন্তব্য