নওগাঁর বদলগাছীতে উন্নয়ন বরাদ্দের অর্ধেকরও বেশী টাকা পিআইও-পিআইসির পেটে
নওগাঁ প্রতিনিধি
নওগাঁর বদলগাছী উপজেলায় বিভিন্ন উন্নয়ন খাতে বরাদ্দকৃত ১ কোটি ১৫ লাখ টাকা প্রকল্পের অর্ধেকরও বেশি টাকা উপজেলা প্রকল্প ব্যাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো: ময়নুল ইসলাম এবং প্রকল্পের সভাপতি (পিআইসি) আত্নসাত করে পকেটস্থ করার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনার সুষ্ঠ তদন্ত করে পুনরায় প্রকল্প পূর্ণাঙ্গ ব্যাস্তবায়ন সহ জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহনের দাবী জানিয়েছে স্থানীয় সচেতন মহল।
তথ্য অধিকার সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, ২০২২-২০২৩ অর্থ বছরে জেলার বদলগাছী উপজেলায় ৮টি ইউনিয়নে গ্রামীন অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ টিআর, কাবিটা ও কাবিখা কর্মসূচীর আওতায় । সাধারন উন্নয়ন খাত এবং সংসদ সদস্যর নির্বাচনী এলাকা ভিত্তিতে ৮৮ লাখ ৭১ হাজার ৪৮০ টাকা ও ৬৩ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য (চাল) যার মূল্য ২৭ লাখ টাকাসহ মোট ১ কোটি ১৫ লক্ষ টাকা বরাদ্দ প্রাপ্ত হয়। কিন্তু উক্ত বরাদ্দে টাকার পুকুরচুরির তথ্য উঠে এসেছে। উপজেলা প্রকল্প ব্যাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও ) মো: ময়নুল ইসলাম প্রকল্পের সভাপতিগণের সঙ্গে জোগসাজস করে ১ কোটি ১৫ লক্ষ টাকা বরাদ্দে নামমাত্র কাজ দেখিয়ে ৭০ লক্ষ টাকায় আত্নসাত করে পকেটে ভরেছে অভিযুক্তরা।
সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বদলগাছী সদর ইউনিয়নের গাবনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় হইতে সাঈদের বাড়ি পর্যন্ত প্যালাসাইডিং সহ মাটিভরাট কাজের বরাদ্দ ১ লাখ ৩২ হাজার ৭৯০ টাকা। এই প্রকল্পে শুধু মাত্র দুই হাজার ইটের প্যালাসাইডিং করা হয়েছে। স্থানীয়দের মতে যার সর্বোচ্চ ব্যায় হবে ৪০ হাজার টাকার মত হবে । একই ইউনিয়নে ধলাহার মান্নানের বাড়ি হইতে আবুলের বাড়ি পর্যন্ত খোলা ডেন নির্মাণ ও মাটি ভরাট কাজের বরাদ্দ ১ লাখ ২৫হাজার টাকা। স্থানীয়রা জানান, প্রকল্পে ২ ফিট প্রস্থ ১০ ইঞ্চি গাঁথুনির ২০০ ফিট ডেন করার কথা ছিল। কিন্তু ১ ফিট প্রস্থ আর ৫ ইঞ্চি গাঁথুনিতে ৮০ ফিট ডেন করেই কাজ শেষ করা হয়েছে। যার অধিকাংশই নিম্ন নামের ইট দিয়ে করা হয়েছে। কোন মাটি ভরাট হয়নি। সর্বোচ্চ খরচ হতে পারে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা।
বিলাশবাড়ি ইউনিয়নের তাজপুর মসজিদ থেকে চার মাথার মোড় হইতে বাহাড়তলী মোড় পর্যন্ত রাস্তার সংস্কার ও আফজালের বাড়ি উত্তর পাশে প্যালাসাইডিং কাজের বরাদ্দ ৩ লক্ষ ৫১ হাজার টাকা। এই প্রকল্পে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা ব্যায় করে শুধু মাত্র প্যালাসাইডিং নির্মাণ করা হয়েছে। রাস্তার সামান্য কিছু মাটি দেওয়া হয়েছে সেটাও ৪০ দিনের কর্মসূচীর শ্রমিক দিয়ে করানো হয়েছে।
আধাইপুর ইউনিয়নের মিষ্টি আলার মোড় হইতে মসজিদ পর্যন্ত রাস্তা সংস্কারের বরাদ্দ ১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। এই প্রকল্প লাগোয়া পুকুর খননের সময় ১৫ ট্রাক্টর মাটি নিয়ে লোক দেখানোর জন্য দিয়েছে। আর কর্মসূচির শ্রমিক দিয়ে সেই মাটি সমান করা হয়েছে। এখানে সর্বোচ্চ ১৫ হাজার টাকা ব্যায় হবে বলে জানান স্থানীয়রা।
বালুভরা ইউনিয়নের নিহনপুর পশ্চিমপাড়া পাকা রাস্তা হইতে ঈদগার মাঠ পর্যন্ত রাস্তা সংস্কার ও ইট সলিং করার জন্য বরাদ্দ ১লাখ ২৫ হাজার টাকা থাকলেও কাজ হয়েছে মাত্র ৩ হাজার ইটের। ব্যায় হবে ৫০ হাজার টাকা। রাস্তা সংস্কারে কোন মাটি কাটা হয়নি। মথুরাপুর ইউনিয়নের থুবশহর আশরাফের বাড়ি থেকে দক্ষিণ দিকে এইচবিবি রাস্তা পর্যন্ত ইট সলিং করনে ৮৬ হাজার ২৭৫ টাকা বরাদ্দ। ৩ হাজার নিম্ন মানের ইট দিয়ে সামান্য কিছু কাজ করা হয়েছে যা এখন চলাচলের অযোগ্য। এই প্রকল্পে ব্যায় হবে ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা। কোলা ইউনিয়নের ভান্ডারপুর জামে মসজিদের সামনে রাস্তায় মাটি ভরাট ও পুখুর পাড়ে প্যালাসাইডিং করণ প্রকল্পের বরাদ্দ ২ লক্ষ ৭৫ হাজার ৬০০ টাকা। এই প্রকল্পে মাটি ভরাট ও প্যালাসাইডিং মিলে সর্বোচ্চ ব্যায় হবে ৭০ হাজার টাকা। ইতিমধ্যে প্যালাসাইডিংয়ের অর্ধেকটা ধসে পরেছে। এই ইউনিয়নের ঘুঘুপাড়া আশ্রয়নে মাটি ভরাটের বরাদ্দ ছিল ১ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা। এই প্রকল্পে কিছু মাটি দেওয়া হয়েছে যা ৫০ হাজার এর বেশী ব্যায় হবেনা।
সদর ইউনিয়নের ছেলেকালী শ্মশানঘাটে মাটি ভরাটের জন্য ১৫ টন ও ৬ নম্বর প্রকল্প আধাইপুর ইউনিয়নের বৈকণ্ঠপুরের মোকলেছ মুহুরীর বাড়ি থেকে পাকারাস্তা পর্যন্ত রাস্তা সংস্কারের জন্য ৮ টন চাল বরাদ্দ দেয়া হয়। এই দুটি প্রকল্পের মোট বরাদ্দের পরিমাণ ২৩ টন চাল যার বাজার মূল্য ১১ লাখ ৪৪ হাজার ২০৮ টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে গত জুন মাসে এই প্রকল্পগুলোর কাজের মেয়াদ শেষ হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এ দুটি প্রকল্পের মধ্যে ১ নম্বর প্রকল্পে ২ টন ও ৬ নম্বর প্রকল্পে ১ টন চালের কাজ হয়েছে নামমাত্রে।
পাহারপুর ইউনিয়নের উচ্চ বিদ্যালয় ও প্রাইমারী স্কুল মাঠে মাটি ভরাটের বরাদ্দ ৩ লাখ ১ হাজার ৭৭৩ টাকা। প্রকল্পে যে পরিমান মাটি কাটা হয়েছে স্থানীয়দের অভিমত ১ লাখ টাকাও ব্যায় হবেনা। মিঠাপুর ইউনিয়ন পরিষদের সার্বক্ষনিক বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য আইপিএস স্থাপনের বরাদ্দ ১ লক্ষ ৪ হাজার টাকা হলেও শুধুমাত্র একটি রহিম আফরোজ আইপিএস ও একটি ভলভো ব্যাটারী কেনা হয়েছে। যার বাজার মূল্য ৩৫ হাজার টাকা । এই ইউনিয়নে খাদাইল উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠ ভরাটের অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করণের ১২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেখিয়ে টাকা উত্তলোন করা হয়। অথচ বিগত অর্থ বছরের বরাদ্দেই কাজটি করা হয়েছে। শুধুমাত্র লোক দেখানোর জন্য কয়েক ট্রাক্টর মাটি দিয়ে পুরু টাকা আত্নসাত করা হয়েছে। এসব প্রকল্পসহ ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে উপজেলার বরাদ্দকৃত ৭৬ প্রকল্প ঘুরে দেখা যায় একই অবস্থা। বরাদ্দের এক তৃতীয়াংশ টাকাও ব্যায় করেনি কোন প্রকল্পে। আর এসব অনিয়ম ও দূর্নীতির একক মাস্টারমাইন্ড উপজেলা প্রকল্প ব্যাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো: ময়নুল ইসলাম বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
বদলগাছী সদর ইউনিয়নের গাবনা গ্রামের সাঈদ হোসেন, আঞ্জুয়ারাসহ একাধিক ব্যাক্তি জানান, স্থানীয় মেম্বার শুধুমাত্র দুই হাজার ইট এনে প্যালসাইডিং করেছে। তাও যে পরিমাণ উঁচু করার কথা ছিল সেটা করেনি। মাঠ থেকে ভ্যানে করে ৬ ভ্যান মাটি এনে দিয়েছে। তাতে ভাল রাস্তা আরও খারাপ হয়েছে। সব মিলে ৪০ হাজার এর বেশী খরচ হবেনা।
বিলাশবাড়ী ইউনিয়নের কটকবাড়ী গ্রামের মিলন হোসেন, আধাইপুরের বৈকুন্ঠপুর গ্রামের বাচ্ছু ও বিদ্যুৎ হোসেন জানান, দুটি প্রকল্পেই কর্মসূচীর শ্রমিকদের দিয়ে সামান্য কিছু কাজ করে নিয়েছেন। এই রাস্তার জন্য কোন বরাদ্দ থাকলে সেটা আত্নসাত করা হয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে কথা হলে উপজেলা প্রকল্প ব্যাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো: ময়নুল ইসলাম বলেন, বরাদ্দ পাওয়া সকল কাজগুলোই সঠিক নিয়মে করা হয়েছে। আর কিছু কাজ এখনও সম্পন্ন হয়নি। সেগুলোও দ্রুত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করা হবে। এখানে কোন রকম অনিয়ম হয়নি। তারও যদি কোন কাজে সমস্যা থাকে আপনি যদি জানান বা ধরে দেন তবে আমরা অবশ্যই সেগুলো গুরুত্ব সহকারে দেখবো।##