প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাদীক্ষা আরেকটু এগিয়ে নিতে কন্যার সাথে একাদশ শ্রেণিতে ইউপি প্যানেল চেয়ারম্যান গোলাম রব্বানী
মুনসুর রহমান তানসেন, কাহালু
জনসেবা মূলক কাজের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাদীক্ষায় নিজেকে আরেকটু এগিয়ে নিতে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজের কন্যার সাথে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছেন বগুড়ার কাহালু উপজেলার নারহট্ট ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান গোলাম রব্বানী আকন্দ। সম্প্রতি এক সাক্ষাতকারে তার অতীত ও বর্তমান জীবানাচরণের সুখ-দুঃখের গল্প তুলে ধরেন এই প্রতিবেদকের কাছে।
জানা গেছে, দিন মজুরের ঘরে জন্ম নেওয়া এবং নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠা মোঃ গোলাম রব্বানী আকন্দ তার ইচ্ছাশক্তি দিয়েই নিজেকে সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। পল্লী চিকিৎসা, জনসেবা আর জনকল্যাণমূলক কাজে সকলের কাছেই তিনি সততার পরিচয় দিয়েছেন। তার কথা আর কাজে মিল থাকায় একজন ভালো জনপ্রতিনিধি হিসেবেও তার খ্যাতি রয়েছে স্থায়ী জনসাধারণের কাছে।
গোলাম রব্বানী ১৯৮০ সালে ১ অক্টোবর বগুড়ার কাহালু উপজেলার নারহট্ট ইউনিয়নের উলখার গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তার পিতার নাম জনাব আলী আকন্দ ও মাতার নাম আবেদা বেগম। মোট ৬ ভাই-বোনের মধ্যে গোলাম রব্বানী পিতা-মাতার দ্বিতীয় সন্তান। তাদের পরিবারের ৮ সদস্যের সংসারে সারা বছরই অভাব-অনটন লেগে থাকতো। পিতা জনাব আলী আকন্দ দিন মজুরের কাজ করে শত কষ্টের মধ্যেও তাদের সংসারের ঘানি টেনে নিয়ে তাদেরকে আলোর মুখ দেখিয়েছেন।
টানাপোড়নের সংসারে খেয়ে না খেয়ে গোলাম রব্বানী নিয়মিত স্কুলে যেতেন। স্কুল থেকে এসে সময় পেলেই পিতার কাজে সহযোগিতা করতেন। তিনি যখন তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র তখন কলেরায় একদিনে তার গ্রামের ৭ জন মানুষ মারা যান। সেই সময় ইউনিসেফ একটি প্রকল্পের মাধ্যমে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের তাৎক্ষণিকভাবে স্যালাইন তৈরির প্রদ্ধতি শিখানো হয়। উলখার গ্রামের ৭ জনের মৃত্যুর কথা ভেবে, গোলাম রব্বানী ছোট হলেও তিনি স্যালাইন তৈরি করা শিখেছেন শুধু মানুষকে কলেরা থেকে রক্ষা করবার জন্য। ওই সময় কলেরায় কেউ আক্রান্ত হলে স্যালাইনে কাজ না হলে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে শিশুকাল থেকেই তিনি মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করেছেন। মানুষের প্রতি তার মমতা দেখে গ্রামের লোকজন তাকে শিশুকাল থেকেই ডাক্তার নামে ডাকতেন। তার ডাক্তারী কোনো ডিগ্রি না থাকলেও শিশুকাল থেকে এখন পর্যন্ত মানুষের কাছে তিনি ডাক্তার হিসেবেই পরিচিত।
নানা প্রতিকূলতার মধ্যে থেকেও ১৯৯৫ সালে দুপচাঁচিয়া পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে গোলাম রব্বানী এসএসসি পাশ করেন। এরপর দরগাহাট কলেজে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হলেও পিতা-মাতার সংসারে অভাব-অনটনের কারণে শত ইচ্ছে থাকা সত্তে¡ও তিনি এইচ এসসি পরীক্ষা দিতে পারেননি। তার ইচ্ছে ছিন লেখাপড়া শিখে একদিন তিনি ডাক্তার হয়ে নিজেকে মানুষের স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত করবেন। কিন্তু তার সেই স্বপ্নে ভাটা পড়লেও ইচ্ছাশক্তি আছে বলেই তাকে কেউ দমিয়ে রাখতে পারেনি। পল্লী চিকিৎসক হিসাবে প্রশিক্ষণ নিয়ে মানুষের স্বাস্থ্যসেবার কাজে এখনো তিনি নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। তিনি নিজ গ্রামসহ অন্যান্য গ্রামে গিয়েও মানুষের ছোটখাটো রোগের চিকিৎসা সেবা দেওয়ার পাশাপাশি ধর্মীয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সামাজিক সংগঠনের নেতৃত্ব দিয়েছেন সফলতার সাথে। অনেক আগে তিনি বিএনপির সহযোগী সংগঠনের সাথে জড়িত থাকলেও এখন তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পৃক্ত নেই বলে জানানো হয়েছে।
মানুষের সেবায় নিজেকে সবসময় নিয়োজিত রাখার কারণে ২০১১ সালে গ্রামের লোকজন তাকে ইউপি সদস্য পদে দাঁড় করিয়ে দেন। সেই নিবাচনে তিনি মাত্র ১৯ ভোটে প্রতিদ্ব›দ্বী প্রার্থীর কাছে পরাজিত হলে পরবর্তী দুটি নির্বাচনে অংশ করেননি। ২০২১ সালে তিনি নারহট্ট ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিপুল ভোটে মেম্বার নির্বাচিত হন। মেম্বার নির্বাচিত হওয়ার পর নিয়মিতভাবে তিনি সকাল ৯ থেকে বিকাল ৫ টা পর্যন্ত পরিষদে বসে জনসেবার কাজ করেছেন। আবার পরিষদ থেকে বিবিরপুকুর তার ঔষুদের দোকানে গিয়ে একজন পল্লী চিকিৎসক হিসেবে স্থানীয় রোগীদের স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার কাজও করছেন আন্তরিকভাবে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখে আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদ থেকে আওয়ামীলীগ সমর্থিত অধিকাংশ চেয়ারম্যানকে পদচ্যুত করা হয়। নারহট্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গ্রেফতার হওয়ার পর প্যানেল চেয়ারম্যান হিসাবে উপজেলা প্রশাসন গোলাম রব্বানীকে ওই ইউনিয়ন পরিষদ পরিচালনার দায়িত্ব দেন। ওই সময় সাধারণ নাগরিকের বড় সমস্যা ছিল জন্ম নিবন্ধন পাওয়ার ক্ষেত্রে। গোলাম রব্বানী নারহট্ট ইউনিয়ন পরিষদ পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়ার পর সর্বপ্রথম জনগণের ভোগান্তি কমাতে উপজেলা প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ করে জন্ম নিবন্ধন যাতে মানুষ সহজে পান, সেই বিষয়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তিনি বিভিন্ন দপ্তরে গিয়ে ইউনিয়ন পরিষদের জন্য বাড়তি বরাদ্দ নিয়ে জনকল্যাণ ও উন্নয়ন মূলক কাজেও বেশ ভালো ভূমিকা রেখছেন।
নারহট্ট ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামের মানুষের সাথে কথা বলে জানান গেছে, একটি ওয়ার্ড থেকে মেম্বার হয়ে আসা গোলাম রব্বানী পুরো ইউনিয়ন পরিষদ পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই একজন দক্ষ জনপ্রতিনিধির মতোই তিনি অনেক ভালো কাজ করছেন। নিয়তান্ত্রিকভাবে কোনো কাজের জন্য গেলে তিনি খুব দ্রæত সেই কাজ করে দেন। একজন পল্লী চিকিৎসক হিসাবে তার যেমন সুনাম রয়েছে তেমনি ইউনিয়ন পরিষদ পরিচালনার ক্ষেত্রেও অনেকটা সফল হয়েছেন।
গোলাম রব্বানী বলেন, আমার ইচ্ছে ছিল উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত এবং ডাক্তার হয়ে মানুষের স্বাস্থ্যসেবা করার। কিন্ত দরিদ্রতার কারণে সেই সুযোগ না হলে আল্লাহর রহমতে আমি পল্লী চিকিৎসা দেওয়ার পাশাপাশি জনপ্রতিনিধি হয়ে জনসেবা ও জনকল্যাণ মূলক কাজের মধ্যেই রয়েছি। এছাড়াও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাদীক্ষায় আরেকটু এগিয়ে যাওয়ার জন্য গত বছর আমার মেয়ে রওনক জাহানের সাথে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছি। জনসেবার পাশাপাশি লেখাপড়া খুবই কষ্টসাধ্য হলেও এখানো আমার ইচ্ছাশক্তি রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় অগ্রসর হওয়ার।