টাঙ্গাইলে মর্মান্তিক সড়ক দূর্ঘটনায় নিহত ১৫ জনের মধ্যে ১৩ জনের বাড়ি নওগাঁতে:
নওগাঁ প্রতিনিধি
রাজধানী ঢাকা –উত্তারাঞ্চল মহাসড়কের টাঙ্গাইলের যমুনা সেতুর পূর্বপাশে মর্মান্তিক সড়ক দূর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৫ জন। এদের মধ্যে ১৩ জনের গ্রামের বাড়ি নওগাঁতে। আবার ১১ জনের বসতবাড়ি নওগাঁর মান্দা উপহজলার ভারশো ইউনিয়নের তিনটি গ্রামে। সড়ক দুর্ঘটনায় উর্পাজনক্ষম প্রিযজনদের হারিয়ে দিশেহারা ১১টি পরিবারের সদস্যদের মাঝে বইছে এখন মোকের মাতম। স্বজনদের আহাজারীতে ভারী হয়ে উঠেছে এলাকা। শোকে স্তব্দ হয়ে পড়েছে পুরো এলাকা।
প্রত্যক্ষদর্শী,পুলিশ ও নিহতদের পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, নওগাঁর মান্দা উপজেলার ভারশো ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামের বেশ কিছু মানুষ গত ২০ বছর ধরে তারা দেশের নোয়াখালী ফেনীসহ বিভিন্ন এলাকায় হরেক রকম জিনিসপত্র নিয়ে ফেরি করি জীবিকা নির্ভর করে আসছিল। গত দিনদিন আগে গ্রামে ফিরে আসা ফেরিওয়ালা আশরাফুল ইসলাম বলেন ,গত ঈদুল ফিতরের দশ দিন পরে ওই ইউনিয়নের রাজেন্দ্রবাটি, পাকুরিয়া, মুর্শিদপুর, সগুনিয়া,বিলশ্রীকলা,বিলশরশুনিয়াসহ ১০/১২ টি গ্রামের প্রায় ২৫ জন ফেরিওয়ালা ব্যবসার করার জন্য নোয়াখালীর উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হয়ে যান। ব্যবসা শেষে পরিবারের সাথে কুরবানি ঈদ করার জন্য তারা রবিবার দুপুরে রড বোঝাই ট্রাকে করে তারা বাড়ি ফিরছিলেন। সোমবার ভোরে ঘটনাস্থলে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ট্রাকটি রাস্তার পাশে খাদে পড়ে যায়। এটি রডের নিচে চাপা পড়ে ঘটনাস্থলে ১৫ জন নিহত হয়। আহত হয়েছেন আরো ১০ জন। মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় নওগাঁর মান্দা উপজেলার ভারশোঁ ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের ১১ জন বাসিন্দা প্রাণ হারিয়েছেন। আর ১ জনের বাড়ী নিয়মতপরে উপজেলার মালঞ্চি গ্রামে। একজনের এখনো পরিচয় সনাক্ত করা যায়নি।
নিহতদের মধ্যে রাজেন্দ্রবাটি গ্রামের বাসিন্দা হলেন মোঃ সুলতান হোসেন ছেলে মোহাম্মদ তারেক, মোঃ আব্দুর রশিদের ছেলে মোঃ আব্দুল বারেক, মোঃ আব্দুর রহিমের ছেলে মোহাম্মদ বাদশা, একাব্বরের হোসেনের ছেলে মোঃ সোহাগ হোসেন, মোঃ শহিদুলের ছেলে মোহাম্মদ রবিউল এবং মোহাম্মদ সাকিমের ছেলে মোহাম্মদ সাগর। এছাড়া মুর্শিদপুর গ্রামের মৃত জাফর আলীর ছেলে মোহাম্মদ মইনুর ইসলাম এবং পাকুড়িয়া গ্রামের আব্দুর রশিদের দুই ছেলে মোহাম্মদ মাইনুল ও মোহাম্মদ গিয়াসও এই দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন।
রাজেন্দ্রবাটি গ্রামের ফিরোজ হোসেন জানান, উত্তর নাজিরপুর কলোনিতে এ এলাকার শতাধিক যুবক বছরজুড়ে হরেক পণ্যের ব্যবসা করেন। ঈদের সময় বাসে বাড়ি ফিরতে জনপ্রতি ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকা গুনতে হয়। অতিরিক্ত ভাড়া এড়াতে অনেকেই পণ্যবাহী ট্রাকে যাতায়াত করেন। নিহতরাও একইভাবে ট্রাকে করে বাড়ি ফিরছিলেন।
নিহত তারেকের বাবা সুলতান হোসেন কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, তারা নোয়াখালী এলাকায় ফেরি করে মানুষের চুল কেনা, ভাংরী মোবাইল ও ছোট ছোট প্লাস্টিকের খেলনা বিক্রি করতো। ঈদের ছুটিতে সবাই মিলে একসাথে বাড়ি আসছিল। বাসে ১৮০০ টাকা ভাড়া বেশি চাচ্ছিল, তাই একটু টাকা বাঁচাতে সবাই মিলে ট্রাকে উঠেছিল। ফেনী থেকে তারা ট্রাকে যাত্রা শুরু করে। কিন্তু এই সামান্য টাকার জন্য তাদের সব শেষ হয়ে গেল।
হঠাৎ দুর্ঘটনায় স্বামীকে হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন নিহত বাদশা মিয়ার স্ত্রী সাবিনা খাতুন। একমাত্র মেয়ে রাহী মনিকে নিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন তিনি। তাকে শান্তনা দিতে গিয়ে স্বজনেরাও কান্না থামাতে পারছেন না। কান্নাজড়িত কণ্ঠে সাবিনা খাতুন বলেন, ‘বাড়ি ফেরার পথে স্বামীর সঙ্গে কয়েকবার কথা হয়েছে। মেয়ের জন্য নতুন জামা আর মেহেদী কেনার কথাও বলেছিল। রাত ১০টার দিকে শেষ কথা হয়। সকালে তার মৃত্যুর খবর পাই। এখন আমার মেয়েকে কিভাবে মানুষ করবো। সংসার চলবে কিভাবে।
একই গ্রামের নিহত রবিউল ইসলাম এর মা কহিনুর বেগম ছেলে মোকে বার বার মূর্ছা যাচ্ছেন। প্রতিবেশী ও স্বজনরা তাকে সান্তনা দিয়েও বুঝাতে পারছেন না। তিনি বলেন একই র্দূটনায় আমার দুই ছেলে রবিউল ও রমেস মন্ডল ছিল। বড় ছেলে মারা যাওয়ার খবর পেয়েছি। ছোট ছেলে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে। তার অবস্থাও ভাল না। দুই ছেলের আয় দিয়েই আমাদের সংসার চলে। রবিউলের মাত্র দেড় বছরের ছেলে রয়েছে। এখন আমাদের সংসার চলবে কি করে। একই কথা বলে নিহত আবুল বারীর স্ত্রী মারুফা খাতুন। মাত্র এক বছর আগে তাদের বিয়ে হয়েছে। আমি বাপের বাড়ি ছিলাম। নোয়াখালী থেকে বাড়ি আসার সময় রবিআর দুপুরে আমার সাথে কথা হয়। রবিউর বলে তুমি বাড়ি চলে আস। একসাথে কুরবানীর ঈদ করবো। সকালে জানতে পারি আমার স্বামী মারা গেছে। এখন আমি কিভাবে চলব।
একই ইউনিয়নের ১০ যুবকসহ ১১ জনের এমন আকস্মিক ও মর্মান্তিক মৃত্যুতে ভারশোঁ ইউনিয়নসহ পুরো মান্দা ও নিয়ামতপুর উপজেলায় কান্নার রোল পড়েছে। নিহতদের পরিবারে চলছে চরম আহাজারি। উপার্জনক্ষম সন্তানদের হারিয়ে দিশেহারা বাবা-মা ও স্বজনেরা।
মান্দা উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) আকতার জাহান সাথী জানান, নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক শরিফা হকের সাথে কথা বলেছেন, নওগাঁর মৃতদেহ গুলো টাঙ্গাইল থেকে নওগাঁ নিয়ে আসার জন্য নওগাঁ জেলা প্রশাসন, মান্দা উপজেলা প্রশাসন এবং টাঙ্গাইল জেলা প্রশাসন যৌথ উদ্যেগ গ্রহন করেছেন। তারা সরকারী খরচে এই মরদেহ গুলো নিয়ে আসা, দাফনসহ সার্বিক বিষয়ে প্রশাসন সহযোগীতার করছেন। এছাড়া, নিহতদের পরিবারকে শুকনো খাবারসহ প্রয়োজনীয়েআর্থিক সহযোগীতার করা হচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, আইনগত প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ গুলো টাঙ্গাইল থেকে নওগাঁ আসতে রাত ৯টা হয়ে যেতে পারে। তিনি বলেন, নিহতদের পরিবার ও গ্রামবাসীর সাথে আলোচনা করে জানাযা ও দাফনের সময় নির্ধারণ করা হবে।