বীজের মূল্য, জমি ভাড়া এবং মজুরী বৃদ্ধিতেই চাষীরা ক্ষতিগ্রস্থ

বগুড়ায় লোকসান ঠেকাতে কৃষক আলু  উত্তোলন না করে ঘুম পাড়িয়ে রাখছেন!

বিশেষ প্রতিবেদন
প্রকাশ: ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ২০:৪৬ ।
দেশের খবর
পঠিত হয়েছে ৯৯ বার।

‘এখন আলু উত্তোলন করলে লোকসান গুণতে হচ্ছে। তাই আমরা আলুগুলোকে আরও ১৫/২০দিন ঘুম পাড়িয়ে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তাতে ফলন কিছুটা বাড়বে এবং ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হতে পারে।’ কথাগুলো বলছিলেন বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার পীরব গ্রামের কৃষক সোহেল হোসেন। আলুকে ‘ঘুম পাড়িয়ে রাখা’ বলতে তিনি মূলত দেরিতে উত্তোলনের কথাই বলছেন।

 

কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী বিগত বছরগুলোর মত এবারও বগুড়ায় সারাদেশের চেয়ে সবচেয়ে বেশি ৬০ হাজার ৪৩৫ হেক্টর জমিতে আলুর আবাদ হয়েছে। আর জেলার মধ্যে উপজেলা পর্যায়ে সবচেয়ে বেশি এবং লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও ১ হাজার মেট্রিক টন বেশি মোট ১৯ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে আলুর আবাদ হয়েছে শিবগঞ্জ উপজেলায়। সারাদেশের মধ্যে বগুড়ায় সবচেয়ে বেশি জমিতে আলুর আবাদ হলেও উৎপাদনের ক্ষেত্রে বগুড়া তৃতীয় স্থানে রয়েছে। বগুড়ায় প্রতি হেক্টর জমিতে গড়ে ২২ মেট্রিক টন আলু উৎপাদিত হয়। আর মুন্সিগঞ্জে গড়ে ৩০ মেট্রিক টন ফলন পাওয়া যায়। সাধারণত নভেম্বরের মাঝামাঝিতে আমন ধান কাটার পর আলুর চাষ শুরু হয়। ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি থেকে আলু উত্তোলন শুরু হয়। তবে কোন কোন এলাকায় অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে আগাম জাতের আলু আবাদ করা হয়। যা জানুয়ারির মাঝামাঝিতে উত্তোলন করা হয়। আগাম জাতের ওই আলুর দামও স্বাভাবিক সময়ে উত্তোলন করা আলুর দেড় থেকে দুইগুণ পর্যন্ত বেশি হয়। 

 

 

কৃষি বিভাগের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় এবং উচ্চ ফলনশীল মিলে মোট ৪৮ জাতের আলুর আবাদ হয় বগুড়ায়। এর মধ্যে এবার সবচেয়ে বেশি আবাদ হয় এস্টারিক্স (স্থানীয়ভাবে স্টিক নামে পরিচিত) নামে উচ্চ ফলনশীল জাতের আলু। সরেজমিন ঘুরে কৃষক এবং কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে গেছে, এবার কোন রোগ বালাই ছাড়াই  চাষীরা আলু ঘরে তুলতে পারছেন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলনও ভাল হয়েছে। অথচ গত বছর ছত্রাকের আক্রমণসহ নানাকারণে ফলন কমেছিল গড়ে ৩০ শতাংশ। তবে গত বছর মৌসুমের শুরুতে অর্থাৎ জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝি আলুর দাম ছিল ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা পর্যন্ত। অবশ্য ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে তা ৭০০ টাকায় নেমে এসছিল। কিন্তু এবার জানুয়ারি মাঝামাঝি প্রতি মণ আলু ১ হাজার টাকা থেকে ১ হাজার ১০০ টাকা মণ দরে কেনা বেচা হলেও বর্তমানে জাত ভেদে তা ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকায় নেমে এসেছে। 

 


কৃষকরা বলছেন, গত বছর বিপুল সংখ্যক ব্যবসায়ীকে মাঠে মাঠে গিয়ে কৃষকদের কাছ থেকে আলু কিনতে দেখা গেছে। কিন্তু এবার এখন পর্যন্ত তাদের দেখা মিলছে না। এ কারণে আগামীতে আর দাম বাড়ার সম্ভাবনাও নেই। ফলে তারা আলু উত্তোলন বন্ধ রেখেছেন। অনেকে ফেব্রæয়ারি মাসের পুরোটাই দেখতে চান। দেরিতে উত্তোলনের উপকারিতা সম্পর্কে জানতে চাইলে আবুল ফজল নামে এক আলু চাষী বলেন, কিছুদিন রাখলে গাছে ধরা আলুর সাইজগুলো আরও বড় হবে তখন ওজনও বাড়বে। এর ফলে এখন এক বিঘা জমিতে যদি ৭৫মণ আলু হয় ১৫/২০দিন পর সেটি ১০০ মণ ছাড়িয়ে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নেওয়া সহজ হবে। তিনি অধিক পরিমাণে আলু রপ্তানির জন্য সরকারের উদ্যোগও কামনা করেছেন।

 

কৃষক সোহেল হোসেনের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, তিনি এবার ৬ বিঘা জমিতে আলুর আবাদ করেছিলেন। গত সপ্তাহে তিনি এক বিঘা জমিতে লাগানো মিউজিকা জাতের আলু উত্তোলন করেছেন। তার হিসাবে আবাদের শুরু থেকে উত্তোলন পর্যন্ত এক বিঘা জমিতে তার ৪৮ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। আর এক বিঘা জমিতে তিনি ৭৫ মণ বা ৩ হাজার কেজি আলু পেয়েছেন। তাতে তার খরচ পড়েছে ৪৮ হাজার টাকা। অর্থাৎ প্রতি কেজিতে খরচ হয়েছে ১৬ টাকা। অথচ বাজারে তিনি ৫০০ টাকা মণ দরে অর্থাৎ প্রতি কেজি সাড়ে ১২টা দরে আলু বিক্রি করেছেন। ফলে তার প্রতি কেজিতে সাড়ে  ৩টাকা লোকসান হয়েছে। সেই হিসাবে ৩ হাজার কেজিতে তার সাড়ে ১০ হাজার টাকা লোকসান হযেছে। সোহেল হোসেন বলছেন, এখন আলুর দাম আরও কমতে শুরু করেছে। এমন পরিস্থিতিতে তিনি অন্য ৫ বিঘা জমির আলু আরও ১৫/২০দিন পরে উত্তোলনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সোহেলের উৎপাচন খরচের সঙ্গে একমত হয়েছেন কৃষি অফিসের পীরব ইউনিয়নের উপ-সহকারী কর্মকর্তা মোছাঃ খুরশিদা বিনতে আলম। তিনি বলেন, ‘আমরা এখনও চুড়ান্ত হিসাব করিনি। তবে প্রাথমিকভাবে যে হিসাব পাওয়া গেছে তাতে প্রতি কেজি আলুর উৎপাদন খরচ ১৫ থেকে ১৭ টাকার মধ্যে।’

 


লোকসান কেন?
এবার আলুতে লোকসানের পেছনে আলু চাষীরা মূলত ৪টি কারণকে দায়ী করেছেন। সেগুলো হলো- আলু বীজ ও সার প্রয়োগসহ শ্রমিকদের মজুরী বৃদ্ধি,  সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে অতিরিক্ত দামে সার কেনা এবং জমির লীজের মূল্য বৃদ্ধি। আব্দুল মতিন নামে এক কৃষক জানিয়েছেন, গত বছর আলুতে কিছু লাভবান হওয়ার কারণে এবার জমির লীজ ও মজুরী বেড়ে গেছে। আর বীজের মূল্য সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতেই বাড়ানো হয়েছে। গত বছর সরকারিভাবে আলু বীজের দাম ছিল প্রতি কেজি ৫৪ টাকা। এবার তা বেড়ে হয়েছে ৬১ টাকা। তবে সরকারি বীজ অপ্রতুল হওয়ায় অধিকাংশ কৃষককে বেসরকারি কোম্পানি থেকে নানা হাত ঘুরে ৮০ থেকে ৯০ টাকা কেজি দরে বীজ কিনতে হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে প্রতি কেজি বীজের জন্য কৃষককে গড়ে ২০ টাকা বেশি ব্যয় করতে হয়েছে। সেই হিসাবে এক বিঘা জমিতে ২৫০ কেজি বীজের জন্য ৫ হাজার টাকা বাড়তি গুণতে হয়েছে। জমি লীজের মূল্য এক বছরের ব্যবধানে গড়ে ৪ হাজার টাকা বেড়েছে। আর কৃষকের মজুরী বেড়েছে দেড় থেকে দুই হাজার টাকা। একইভাবে বেশি দামে সারও কিনতে হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রতি বিঘা জমিতে এবার বাড়তি ১২ হাজার টাকা খরচ করতে হয়েছে। তবে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা সারের মূল্য বৃদ্ধির কথা নাকচ করলেও অন্য ৩টি ক্ষেত্রে খরচ বৃদ্ধির কথা স্বীকার করেছেন।

 

 

দেরিতে উত্তোলন করলে কৃষক কি ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে পারবেন?
বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার পীরব ইউনিয়ন উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মোছাঃ খুরশিদা বিনতে আলম জানান, আলুর জীবনকাল ৯০ থেকে ৯৫দিন হয়। এখন যারা আলু উত্তোলন করছেন তাদের জীবনকাল ৬৫ থেকে ৭০দিন। সেক্ষেত্রে কৃষকরা আরও ২০ থেকে ২৫ দিন পরেও আলু উত্তোলন করতে পারবেন। এতে কোন ক্ষতি হবে না। তিনি বলেন, ২০/২৫দিন পরে আলু উত্তোলন করা গেলে ফলন কিছুটা বাড়বে। এতে মোট উৎপাদন বাড়লে কৃষক লাভবান হবেন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বগুড়ার শিবগঞ্জ থেকে এরই মধ্যে কিছু আলু রপ্তানী শুরু হয়েছে। যারা রপ্তানী করতে চান তাদেরকে আলু উত্তোলনের অন্তত ১৫ দিন আগে পানি সেচ দেওয়া বন্ধ রাখতে হবে। 
বগুড়া জেলা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মতলুবর রহমান কৃষকদের হতাশ না হয়ে নিজ উদ্যোগে বাড়ি বাড়ি আলু সংরক্ষণের পরামর্শ দিয়ে বলেন, ‘বগুড়ায় এবার আলুর উৎপাদন ১৩ লাখ মেট্রিক টন ছাড়িয়ে যেতে পারে। অথচ বগুড়ায় হিমাগারগুলোতে মাত্র সাড়ে ৩ লাখ মেট্রিক টন আলু সংরক্ষণ করা সম্ভব। ভাল দাম পেতে হলে বাড়তি আলু সংরক্ষণ করতে হলে বাড়ি বাড়ি সংরক্ষণ করতে হবে। আমরা এ ব্যাপারে পরামর্শ দিচ্ছি।’