এনসিপির আরেক শীর্ষ নেতার পদত্যাগ
পুণ্ড্রকথা ডেস্ক
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে পদত্যাগ করেছেন কেন্দ্রীয় যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক খান মুহাম্মদ মুরসালীন।
বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) দুপুরে ফেসবুকে এক পোস্টে পদত্যাগের ঘোষণা দেন তিনি।
ওই পোস্টে তিনি লিখেন, ‘আমি খান মুহাম্মদ মুরসালীন এতদিন জাতীয় নাগরিক পার্টির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে এসেছি। এছাড়াও পার্টির মিডিয়া সেল, প্রচার ও প্রকাশনা সেলে কাজ করেছি। সম্প্রতি পার্টির নির্বাচনকালীন মিডিয়া উপকমিটির সেক্রেটারি হিসেবে কিছুদিন দায়িত্ব পালন করেছি।’
মুরসালীন লিখেন, ‘সম্প্রতি পার্টির নির্বাচনকালীন মিডিয়া উপকমিটির সেক্রেটারি হিসেবে কিছুদিন দায়িত্ব পালন করেছি। আজ থেকে এনসিপির সব দায়িত্ব ও পদ থেকে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
তিনি আরও লিখেন, ‘আমি আজ থেকে এনসিপির সকল দায়িত্ব ও পদ থেকে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কেন এই সিদ্ধান্ত নিলাম, সেই বিস্তারিত ব্যাখ্যা ভিডিও বার্তায় জানালাম। এনসিপি থেকে পদত্যাগ করলেও রাজনীতি থেকে পদত্যাগ করছি না। দেখা হবে রাজপথে।'
ভিডিও বার্তায় মুরসালীন বলেন, ‘জাতীয় নাগরিক পার্টির সকল প্রকার দায় এবং দায়িত্ব থেকে আমি নিজেকে প্রত্যাহার করে নিচ্ছি। আমি পদত্যাগ করছি। এর একটি কারণ আসলে ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। সেটা হচ্ছে, যেই লক্ষ্যকে সামনে নিয়ে এনসিপির আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল, সেটা হচ্ছে নতুন সংবিধান। এরপরে হচ্ছে নতুন রিপাবলিক বা নয়া বন্দোবস্ত। একটি বৈষম্যহীন বাংলাদেশ। এই কথাগুলোর মানেই হচ্ছে বাংলাদেশকে ‘ডিকলোনালাইজ’ করা।’
তিনি বলেন, ‘জন্মলগ্ন থেকেই এবং তারও আগে ব্রিটিশ আমল থেকে আসলে বাংলাদেশ একটি ঔপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থার মধ্যে আবদ্ধ হয়ে আছে। ১৮৫৮ সালে যখন রানি ভিক্টোরিয়া এই অঞ্চলটাকে ঔপনিবেশিক হিসেবে ঘোষণা করে এবং এখানকার আইন, পূর্বতম আইন সামাজিক মূল্যবোধ ধর্মীয় মূল্যবোধ আচার সবকিছুকে পদদলিত করে একটি শাসন ব্যবস্থা প্রণয়ন করে। সেটার মূল আদর্শটাই ছিল হচ্ছে 'জুডিও খ্রিস্টান ইডিওলজি'। এর মানে হলো, আমরা হচ্ছি শাসকের গোষ্ঠী এবং আমরা স্রষ্টা প্রদত্ত মনোনীত। ফলে আমরা যা করব সেটা মূলত স্রষ্টার নির্দেশক্রমে এবং আদেশক্রমেই। এর ফলে যে ডিলেমাটা তৈরি হয়, সেটা হচ্ছে, এই ধরনের শাসকেরা জনগণের ওপরে যে ধরনের নির্যাতন, অত্যাচার ও নিপীড়ন চালায়, সেটা মূলত স্রষ্টার নির্দেশেই তারা তাদের জাতির বৃহত্তর স্বার্থে ক্ষুদ্র একটি গোষ্ঠীর ওপরে অত্যাচার নির্যাতন চালাচ্ছে। এর ধারাবাহিকতায় একাত্তর পরবর্তীতে আমরা দেখেছি যে, বাংলাদেশে যারাই শাসকের ভূমিকায় পালন করেছে, তারা আসলে মূলত সেই ইংরেজদের মতোই আচরণ করেছে। নিজ জনগোষ্ঠীর সঙ্গে তারা জাতির বৃহত্তর স্বার্থের কথা বলে দেশের সাধারণ জনগণকে অত্যাচার নির্যাতন নিপীড়নের মধ্যে রেখেছে। যার সর্বশেষ আপডেটেড ভার্সন আমরা এই স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার ১৬ বছরের এই স্বৈরাচারী আমলটাতে দেখেছি। আওয়ামী লীগ জাতির বৃহত্তর স্বার্থের কথা বলে কীভাবে গুম-খুন করেছে এবং এই গুম-খুনকে জায়েজ করে।’
তিনি আরও বলেন, ‘চব্বিশের গণভুত্থানের পর এনসিপি যে নতুন বন্দোবস্তের কথা বলল, এই নতুন বন্দোবস্ত আসলে সেই উপনিবেশিক আমল থেকে বের হয়ে আসার একটি প্রক্রিয়া। এই সংগ্রাম আজকের না। এই সংগ্রাম তো শত শত বছর ধরে হয়ে আসছে। আমি নিজে ব্যক্তিগতভাবে এই উপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আছি। আমার দাদাজান একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি খান মোহাম্মদ মইনুদ্দিন কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন করেছেন। তিনি হুগলী জেলের ১১ নম্বর সেলে কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে জেল খেটেছেন ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন করার জন্য। তারা একসঙ্গে ৩৯ দিন অনশন করেছেন। আমার বাবা সারাজীবন সেই উপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লেখালেখি করেছেন, কলাম লিখেছেন, সাংবাদিকতা করেছেন, সাহিত্য রচনা করেছেন। আমি নিজে ১০ বছর সাংবাদিকতা করেছি। আমার গোটা ১০ বছরের সাংবাদিকতা জীবনটাই মূলত একটি রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী তৈরির ক্ষেত্রে নিয়োজিত করেছিলাম এই কলোনাইজড একটা সিস্টেম থেকে বের হয়ে আসার ক্ষেত্রে যাতে তারা 'কনশাসনেস' তৈরি করতে পারে। আমি ২০১৮ সাল থেকে যখন প্রকাশনায় আসি, আমার সেই প্রকাশনার মাধ্যমে উপনিবেশিক ব্যবস্থা থেকে বের হয়ে আসতে একটি রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী গঠনের ক্ষেত্রে আমি আমার ক্ষুদ্র জায়দিয়েছিলাম।’
আক্ষেপ করে তিনি বলেন, ‘কিন্তু পরবর্তীতে গিয়ে দেখা গেল যে, এই গণভুত্থানের মূল যে শক্তি, যেসব শ্রমিক যারা সবচাইতে বেশি জীবন দিল, সেই শ্রমিকদের আমরা আসলে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসতে পারিনি। একটি রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী হিসেবে গড়ে তুলতে পারিনি। যেই গণঅভ্যুত্থানে যেই মায়েরা, যে বোনেরা নিজেদের ভাইদের লাশ নিয়ে মিছিল করেছে, যেই মায়েরা নিজেদের আঁচলের মধ্যে আগলে রেখেছে, নিজেরা বন্দুকের সামনে বুক পেতে দিয়েছে, ঢাল হিসেবে দাঁড়িয়েছিল, আজকে তারাই সবচাইতে বেশি নিগৃহীত হয়েছে। তাদের সচেতনভাবে পর্দার আড়ালে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী হচ্ছে নারী। সে নারীদের কণ্ঠ হয়ে ওঠার কথা ছিল এই বীর নারীদের। আমার এই মায়েদের, আমার এই বোনেদের আজকে কেন পর্দার অন্তরালে পাঠিয়ে দেওয়া হলো? এখানে তো এনসিপির একটি সাহসী ভূমিকা রাখার কথা ছিল। কিন্তু তারা সে জায়গায় ব্যর্থ হয়েছে। এই গণ অভ্যুত্থানের নামই ছিল 'ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান'। সেখানে ছাত্ররা আকাঙ্ক্ষার জায়গা থেকে এই পরিবর্তনটি চেয়েছিল, সেখানেও এনসিপি আসলে নিজেদের ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।’
জুলাই ঘোষণা ও সনদে এনসিপি আপস করেছে এমন অভিযোগ এনে মুরসালীন বলেন, ‘যখন জুলাইয়ের ঘোষণাপত্র রচনা করা হয়, তখন আমরা বলেছি, এটা কম্প্রোমাইজ ডকুমেন্ট। যে প্রক্রিয়ায় এই ঘোষণাপত্র যেভাবে হয়, এটা আসলে সঠিক প্রক্রিয়া নয়। কিন্তু সেখানেও আমরা দেখেছি যে, এনসিপি শক্ত অবস্থান নিতে ব্যর্থ হয়েছে। বলা হয়েছিল যে, ঘোষণাপত্র ছাড় দিলেও আমরা সনদে বিন্দুমাত্র ছাড় দেব না। কিন্তু আমরা পরবর্তীতে দেখেছি এনসিপি আসলে সনদেও ছাড় দিতে বাধ্য হয়েছে। কেন বাধ্য হয়েছে? কারণ জনগণকে তারা রাজনৈতিক জনগোষ্ঠীতে পরিণত করতে ব্যর্থ হয়েছে। এই কারণেই তারা দুর্বল হয়েছে। এই দুর্বলতার কারণেই তাদের এখন সেই আগের রাজনৈতিক বন্দোবস্তের যে অংশীজনরা আছে, তাদের সাথে তাদের বিভিন্ন কোলাবরেশনে যেতে হচ্ছে। বিভিন্ন আপসকামিতায় যেতে হচ্ছে। ফলে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, আমার দেড় দশকের যে লড়াই, সেই লড়াইটা মূলত আসলে জারি রাখতে হবে। এই উপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থা থেকে বের হয়ে আসার লড়াইটা আসলে দীর্ঘ। সেটা জনগণের কাতারে দাঁড়িয়েই চালিয়ে যেতে হবে। ফলে আমার কাছে ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়েছে, এনসিপির এখন যে চলার পথ এবং আমাদের যে এই গণরাজনৈতিক ধারার যে চলার পথ, তা আসলে এখন দুইদ
তিনি বলেন, ‘আমি এনসিপি থেকে পদত্যাগ করছি। কিন্তু রাজনীতি থেকে অবসর নিচ্ছি না। দীর্ঘ লড়াইয়ে জনতার কাতারে আবারও দাঁড়াচ্ছি। রাজপথে খুব শিগগিরই আপনাদের সকলের সঙ্গে আবারও দেখা হবে।’
সাম্প্রতিক সময়ে এনসিপি থেকে অন্তত ৯ জন নেতার পদত্যাগের খবর পাওয়া গেছে।