কাজ হারাতে পারেন ১০ হাজার শ্রমিক
নির্মাণ সমাগ্রীর অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধিতে বগুড়ায় আবাসন ব্যবসায় স্থবিরতা
স্টাফ রিপোর্টার
নির্মাণ সামগ্রীর অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধির কারণে বগুড়ায় আবাসন ব্যবসা স্থবির হয়ে পড়েছে। বর্ধিত দামে রড, সিমেন্ট, ইট এবং বালু কিনে নির্মাণ কাজ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব না হওয়ায় আবাসন ব্যবসায়ীরা শহরে ফ্ল্যাট নির্মাণ সংক্রান্ত নতুন করে চুক্তি করা বন্ধ করে দিয়েছেন। ব্যবসায়ীরা বলছেন, আগের কেনা রড ও সিমেন্টের মজুদ শেষ হয়ে গেলে চলমান ফ্ল্যাটগুলোর নির্মাণ কাজও বন্ধ করে দিতে হবে।
বগুড়া রিয়েল এস্টেট অ্যাসোসিয়েশনের নেতৃবৃন্দ জানিয়েছেন, এখন যে বাজার দর তাতে ফ্ল্যাটের প্রতি বর্গফুটের মূল্য গড়ে ১ হাজার টাকা করে বাড়াতে হবে। সেটা সম্ভব না হলে তাদের পক্ষে কোনভাবেই ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না। তখন এ খাতে নিয়োজিত প্রায় ১০ হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়বেন। আগের চুক্তি অনুযাযী বর্তমানে বগুড়া শহরে এলাকাভেদে ফ্ল্যাটগুলো ২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা বর্গফুট দরে বিক্রি হচ্ছে।
প্রায় দুই যুগ আগে বগুড়ায় ফ্ল্যাট নির্মাণ শুরু হয়। এরপর ২০০৫ সালে বগুড়া পৌরসভার আয়তন পাঁচ গুণ বাড়ানো হলে আবাসন ব্যবসায় বিনিয়োগও বাড়তে থাকে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি রাজধানী ঢাকারও অনেক ব্যবসায়ী বগুড়ায় আবাসন খাতে বিনিয়োগে এগিয়ে আসেন। বগুড়া রিয়েল এস্টেট অ্যাসোসিয়েশনের হিসাব অনুযায়ী, তাদের সদস্যভুক্ত ৩৫টিসহ অর্ধশত প্রতিষ্ঠান এ শহরের আবাসন ব্যবসায় সম্পৃক্ত। এখাতে তাদের প্রায় হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ রয়েছে।
বগুড়া রিয়েল এস্টেট অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রূপকথা হোমস্-এর স্বত্বাধিকারী রাজেদুর রহমান রাজু জানান, গত বছরের শেষ দিকে রডের দাম বাড়তে থাকে। চলতি বছরের শুরুতে তা অনেকটা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে। মাত্র কয়েক মাসে রডের মূল্য প্রতি কেজিতে ২৮ টাকা বেড়ে এখন ৯৮ টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। একইভাবে প্রতিটি ইটের দামও গড়ে ৪ টাকা করে বেড়ে ১২টাকায় বিক্রি হচ্ছে। রড ও ইটের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সিমেন্ট ও বালুর দামও এখন আকাশ চুম্বী। তিনি বলেন, ‘আমরা যখন ভূমি মালিকদের সঙ্গে চুক্তি করেছিলাম তখন রড, সিমেন্ট ও ইটের মূল্য বর্তমানের চেয়ে গড়ে ৪০ শতাংশ কম ছিল। এখন নির্মাণ সামগ্রীর যে অগ্নিমূল্য তা দিয়ে কাজ করতে গেলে আমাদের লোকসান গুণতে হবে। ফলে অসমাপ্ত ফ্ল্যাটগুলোতে ইটের গাঁথুনি ও প্লাস্টার ছাড়া নতুন করে আর কোন কাজে হাত দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।’
শহরের সুত্রাপুর এলাকার বাসিন্দা মীর ওয়ালিদ জানান, তাদের পৈতৃক ২৮ শতক জায়গায় ফ্ল্যাট নির্মাণের জন্য চলতি বছরের ফেব্রæয়ারিতে একটি আবাসন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাদের চুক্তি হওয়ার কথা ছিল। এজন্য প্রয়োজনীয় সব নথি চুড়ান্ত করার পর সেই প্রতিষ্ঠানের মালিক নির্মাণ সামগ্রীর মূল্য বৃদ্ধির কথা বলে সেই চুক্তি আর করতে রাজি হচ্ছেন না। শহরের শিববাটি এলাকার বাসিন্দা আমিনুর রহমান জানান, তাদের সঙ্গে যে আবাসন প্রতিষ্ঠানের ফ্ল্যাট নির্মাণের চুক্তি হয়েছিল তারা ৭৫ শতাংশ কাজ শেষ না করতেই নির্মাণ সামগ্রীর মূল্য বৃদ্ধি ঘটে। এতে ওই প্রতিষ্ঠানটি ফ্ল্যাটের মূল্য বৃদ্ধির পরিকল্পনা করছে। সেটা হলে ফ্ল্যাটের বিক্রির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এটা নিয়ে আমরা কিছুটা চিন্তিত।
বগুড়া রিয়েল এস্টেট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সাইরুল ইসলাম জানান, আগে কেনা রড ও সিমেন্ট দিয়ে এতদিন কেউ কেউ নির্মাণ কাজ অব্যাহত রাখতে পেরেছিলেন। কিন্তু মজুদ শেষ হয়ে যাওয়ায় এখন বেশি দামে রড সিমেন্টসহ নির্মাণ সামগ্রী কিনে কারো পক্ষে কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি বলেন, ‘৪/৫ মাস আগে বগুড়া শহরে প্রায় দেড় হাজার ফ্ল্যাটের নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছিল। তবে নির্মাণ সামগ্রীর অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধির কারণে ৯০ শতাংশ ফ্ল্যাটের নির্মাণ কাজ বন্ধ হয়ে গেছে। তাছাড়া নতুন করে কেউ আর চুক্তিও করছেন না। যদি এ অবস্থা আরও কিছুদিন চলতে থাকে তাহলে এ খাতে নিয়োজিত ব্যবসায়ীরা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হবেন তেমনি প্রায় ১০ হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়বেন।
বগুড়া রিয়েল এস্টেট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আনোয়ারুল করিম দুলাল জানান, করোনা মহামারির কারণে গত দু’ বছর আবাসান ব্যবসায় মন্দা গেছে। তিনি বলেন, ‘এ বছর করোনার প্রকোপ কমে আসায় আমরা নতুন উদ্যমে ব্যবসা শুরু করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু নির্মাণ সামগ্রীর মূল্য বৃদ্ধিতে আমরা আবারও হতাশ হয়ে পড়েছি। যদি রড সিমেন্ট ইট ও বালুর মূল্য আগের অবস্থায় নেওয়া সম্ভব না হয় তাহলে ফ্ল্যাটের মূল্য অবশ্যই বাড়াতে হবে।’