পূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন আমলে নেওয়া হচ্ছে না
বগুড়ায় সুউচ্চ ভবনের নকশা অনুমোদনের ক্ষমতা পৌর কর্তৃপক্ষ ফিরে পাবে কি?
বিশেষ প্রতিবেদন
৭ তলার অধিক উচ্চতার ভবনের নকশা অনুমোদনের ক্ষমতা পূর্ত মন্ত্রণালয় পৌর কর্তৃপক্ষের কাছে ফিরিয়ে দিলেও বগুড়ায় তা মানা হচ্ছে না। গত বছরের ২৯ আগস্ট এ সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারির পরেও বগুড়া জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে গঠিত বিল্ডিং কন্সট্রাকশন কমিটি (বিসি কমিটি) নকশা অনুমোদনের ক্ষমতা আগের মতই নিজেদের কাছে রেখেছে। এতে বগুড়া পৌরসভার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা চরম ক্ষুব্ধ। বিস্মিত আবাসন খাতের ব্যবসায়ীরাও।
বগুড়া পৌরসভা কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, নকশা অনুমোদনের ক্ষমতা ফিরে না পাওয়ায় তারা ওই খাতে বিপুল রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অন্যদিকে বসত-বাড়ি নির্মাণেচ্ছু ব্যক্তি এবং আবাসন খাতের ব্যবসায়ীরা বলছেন, একই কারণে দীর্ঘ সূত্রিতা লেগেই আছে। ফলে তাদের ভোগান্তিও দূর হচ্ছে না। কারণ বিসি কমিটিতে নকশা অনুমোদনে ৬ মাসেরও বেশি সময় লেগে যায়। অন্যদিকে পৌরসভায় গড়ে প্রতিমাসেই নকশা অনুমোদন দেওয়া হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সুউচ্চ ভবনের নকশা অনুমোদনের বিষয়টি আগে পৌরসভার এখতিয়ারের মধ্যেই ছিল। তবে ২০১৩ সালের ১৭ নভেম্বর এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে প্রত্যেক জেলায় বিল্ডিং কন্সট্রাকশন কমিটি গঠন করতে বলা হয়। ৭ সদস্যের ওই কমিটিতে সংশ্লিষ্ট জেলার জেলা প্রশাসককে ‘আহবায়ক’ এবং গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলীকে ‘সদস্য সচিব’-এর দায়িত্ব দেওয়া হয়। মূলত ওই প্রজ্ঞাপনের পর পৌরসভাগুলো ৭ তলার অধিক উচ্চতার ভবনের নকশা অনুমোদনের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।
কিন্তু ২০২৩ সালের ২৯ আগস্ট জারি করা প্রজ্ঞাপনে পূর্ত মন্ত্রণালয় বিসি কমিটিতে ব্যাপক পরিবর্তন আনে এবং তার ক্ষমতাকেও পুনর্নির্ধারণ করে দেয়। সদস্য সংখ্যা দু’জন বাড়িয়ে পুনর্গঠন করা ৯ সদস্যের কমিটিতে সংশ্লিষ্ট জেলার জেলা প্রশাসককে ‘সভাপতি’র দায়িত্ব দেওয়া হয়। ওই কমিটিকে সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভার আওতাভুক্ত এলাকা ব্যতীত এলাকাগুলোতে সুউচ্চ ভবনের নকশা অনুমোদন, গুণগত মান বজায় এবং সকল অংশীজনের স্বচ্ছতা ও জবাবদীহিতা নিশ্চিত করতে বলা হয়। অর্থাৎ সর্বশেষ ওই প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে পৌরসভার আওতাভুক্ত এলাকার সুউচ্চ ভবনের নকশা অনুমোদনের আবারও পৌর কর্তৃপক্ষের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নতুন ওই প্রজ্ঞাপনের পর ব্রাহ্মনবাড়িয়া, পটুয়াখালি ও মুন্সীগঞ্জসহ দেশের বেশ কয়েকটি পৌরসভা সুউচ্চ ভবনের নকশা অনুমোদন দেওয়া শুরু করে। এরপর বগুড়া পৌরসভার পক্ষ থেকেও গত বছরের ১২ নভেম্বর বগুড়া জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করা হয়। কিন্তু সেটি আমলে না নিয়ে উল্টো বিসি কমিটি ১৩ নভেম্বর ১৮টি সুউচ্চ ভবনের নকশা অনুমোদন দেয়। এতে পৌরসভা কর্তৃপক্ষ প্রায় ১০ লাখ টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়।
বগুড়া পৌরসভার প্রকৌশল শাখার তথ্য অনুযায়ী, ৭ তলা পর্যন্ত নকশা অনুমোদন বাবদ ২০২২-২৩ অর্থ বছরে ২ কোটি ৮০ লাখ টাকা আদায় হয়েছে। তবে ৭ তলার উর্ধ্বে নির্মানাধীন ভবনের নকশা অনুমোনের রাজস্ব পেলে ওই খাতের আয় ৪ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। বগুড়া পৌরসভার শহর পরিকল্পনাবিদ আল-মেহেদী হাসান জানান, পৌরসভার নকশা অনুমোদন কমিটির বৈঠক প্রতি মাসে হলেও বিসি কমিটির বৈঠক আয়োজনে ৫/৬ মাস লেগে যায়।
বগুড়া শহরের জলেশ^রীতলা এলাকার বাসিন্দা মহরম আলী জানান, ৯ তলা একটি ভবনের নকশা অনুমোদনের জন্য তিনি বিসি কমিটিতে আবেদন করেছিলেন। অনুমোদন পেতে ৩ মাসেরও বেশি সময় লেগেছিল। আবাসন ব্যবসায়ীরা বলছেন, জেলা প্রশাসককে সরকারি অনেক দায়িত্ব পালন করতে হয়। এজন্য তাকে সব সময় ব্যস্ত থাকতে হয়। আর সে কারণেই বিল্ডিং কন্সট্রাকশন কমিটির বৈঠক বিলম্বিত হয়। এতে ভোগান্তি বাড়ে।
সুশাসনের জন্য প্রচারাভিযানের (সুপ্র) বগুড়া জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক কেজিএম ফারুক জানান, স্থানীয় সরকারকে মর্যাদাবান এবং শক্তিশালী করার জন্য সব ধরনের ভবনের নকশা অনুমোদনের বিষয়টি পৌরসভার কাছে ফিরিয়ে দেওয়া জরুরী। তাছা ওই খাত থেকে পৌরসভার আয়ও বাড়বে। সেই আয় বর্জ ব্যবস্থাপনা খাতে ব্যয়ের পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, শহরে যে ১৩টি ডাম্পিং স্টেশন রয়েছে সেগুলো উন্মুক্ত। তাতে দুর্গন্ধের সঙ্গে রোগ-জীবাণুও ছড়ায়। এটা বন্ধের জন্য ডাম্পিং স্টেশনগুলোতে ঘর নির্মাণ করা জরুরী কিন্তু আর্থিক সংকটের কারণে কর্তৃপক্ষ তা পারছেন না। যদি নকশা অনুমোদন খাত থেকে রাজস্ব বাড়ানো যায় তাহলে আমরা নাগরিকরা তখন কর্তৃপক্ষকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা খাতে তা ব্যবহারের জন্য চাপ সৃষ্টি করতে পারি।’
বগুড়া পৌরসভার মেয়র রেজাউল করিম বাদশা জানান, পূর্ত মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী বিসি কমিটি পুনর্গঠন করা হয়েছে ঠিকই কিন্তু সুউচ্চ ভবনের নকশা অনুমোদনের ক্ষমতাটি আমাদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, ‘শুধু পূর্ত মন্ত্রণালয়েরই প্রজ্ঞাপনই নয় বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোডেও (২০২০) সুউচ্চ ভবনের নকশা অনুমোদনের ক্ষমতা পৌরসভাকে দেওয়া হয়েছে। দেশের অনেক পৌরসভা সেই প্রক্রিয়া শুরু করেছে। কিন্তু আমরা এখনও পাইনি। এ কারণে আমরা বিপুল অঙ্কের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। এতে অনেক উন্নয়নমূলক কাজ ব্যাহত হচ্ছে।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বগুড়ায় বিল্ডিং কন্সট্রাকশন কমিটি বা বিসি কমিটি’র সভাপতি স্থানীয় জেলা প্রশাসক মোঃ সাইফুল ইসলাম জানান, পূর্ত মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপন জারি করার আগেই স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে একটি নিদের্শনা দেওয়া হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে ৭ তলার অধিক উচ্চতার ভবনের নকশা অনুমোদনের ক্ষমতা পৌরসভার থাকবে না। তিনি বলেন, ‘এখন পূর্ত মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার আলোকে বগুড়া পৌরসভা কর্তৃপক্ষ যদি সেই ক্ষমতা পেতে চান তাহলে তাদেরকে মন্ত্রণালয়ে আবেদন করতে হবে।’