বগুড়ায় জমি ও সন্দেহের জেরে চাচা খুন: দুই ভাতিজা গ্রেপ্তার
স্টাফ রিপোর্টার
বগুড়ার শেরপুরে ধান ব্যবসায়ী আব্দুল হামিদ মণ্ডল (৩৮) হত্যাকাণ্ডের লোমহর্ষক রহস্য উন্মোচন করেছে পুলিশ। জমির লোভ আর তুচ্ছ সন্দেহের জেরে আপন দুই ভাতিজা মিলে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেছে তাদের চাচাকে। নিহত আব্দুল হামিদের জানাজা শেষে ঘাতক ভাতিজার শরীর কাঁপতে দেখে পুলিশের মনে সন্দেহের দানা বাঁধে, যা পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার অভিযানে পূর্ণাঙ্গ রহস্য উন্মোচনে সহায়তা করে। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন উপজেলার ভবানীপুর ইউনিয়নের ফেরদৌসের ছেলে রাকিবুল হাসান সিয়াম (১৬) ও একই এলাকার গোলাম মোস্তফার ছেলে আতিক হাসান (২১)। মঙ্গলবার দুপুরে তাদের আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন শেরপুর থানা অফিসার ইনচার্জ ইব্রাহিম আলী।
গত ১১ জানুয়ারি ভোরে ভবানীপুর ইউনিয়নের জামালপুর গ্রামের একটি ধানক্ষেত থেকে আব্দুল হামিদের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহতের নাক ও গলায় আঘাতের চিহ্ন দেখে শুরু থেকেই পুলিশ একে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হিসেবে ধারণা করছিল। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (শেরপুর সার্কেল) সজিব শাহরিনের নেতৃত্বে তদন্তে নামে পুলিশের একটি চৌকস দল। পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে আসামিরা ও স্থানীয় সূত্র থেকে জানা যায়, হত্যার পরিকল্পনা ছিল পূর্বপরিকল্পিত। বড় ভাতিজা আতিকের নজর ছিল নিঃসন্তান চাচার অগাধ সম্পত্তির ওপর। কিন্তু ৫ মাস আগে চাচা নতুন বিয়ে করায় আতিক আতঙ্কিত হয়ে পড়েন, যদি চাচার কোনো সন্তান হয় তবে তিনি সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হবেন। অন্যদিকে, ছোট ভাতিজা সিয়ামের মুরগির খামারে কিছুদিন আগে বিষ প্রয়োগে ২৭০০ মুরগি মারা যায়। সিয়ামের ধারণা ছিল এই কাজ তার চাচা হামিদুলই করেছেন। এই যৌথ আক্রোশ থেকে তারা চাচাকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
গত ১০ জানুয়ারি রাত ৮টার দিকে বাড়ির পাশে বেগুন ক্ষেতে আব্দুল হামিদকে একা পেয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে আতিক ও সিয়াম। এরপর গরুর দড়ি দিয়ে পেঁচিয়ে ধরা হয় চাচার গলা। মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর তারা একটি বাঁশের মই ব্যবহার করে লাশটি টেনে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে নিয়ে যায়। সেখানে নিজের জমিতে লাশ ফেলে দিয়ে আতিক চরম আক্রোশে লাথি মেরে বলেন, "তোর জমি তুই নিয়ে থাক!" তদন্তকারী দল সূত্র থেকে জানায়, ঘটনাস্থলে একটি বাঁশের মইয়ের ভাঙা টুকরো পাওয়া যায়। সেই সূত্র ধরে গ্রামের প্রতিটি বাড়ি তল্লাশি করতে গিয়ে সিয়ামের বাড়িতে ভাঙা মইটির সন্ধান পায় পুলিশ। এরপর চাচার জানাজা শেষে সিয়ামের সাথে কথা বলার সময় তার হাত-পা অস্বাভাবিক কাঁপতে থাকে। এতেই পুলিশের সন্দেহ চূড়ান্ত রূপ নেয়। আটকের পর জিজ্ঞাসাবাদে দুই ভাতিজা হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করে।
নিহতের ৮ বছরের শিশু কন্যা মিমি জানায়, তার বাবা গত কয়েকদিন ধরেই এক অজানা আশঙ্কায় ভুগছিলেন। স্ত্রী রাফিয়া বেগম আহাজারি করে বলেন, জমির জন্য এভাবে আপন মানুষের জান নেবে তা কখনো কল্পনাও করিনি। তার উপযুক্ত বিচারের দাবি জানাচ্ছি। শেরপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) ইব্রাহিম আলী জানান, তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় এবং ঘটনাস্থল থেকে সংগৃহীত আলামতের ভিত্তিতে আমরা দ্রুততম সময়ে আসামিদের শনাক্ত করি। আলামত হিসেবে হত্যার কাজে ব্যবহৃত রশি ও মই উদ্ধার করা হয়েছে। আসামিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন।