রোপের উদ্যোগে বিশ্ব বয়স্ক নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস পালন

প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২৬ ১৯:৪৮ ।
বগুড়ার খবর
পঠিত হয়েছে বার।

প্রত্যেক মাতাপিতা তাঁর সন্তানকে ভালবাসে। প্রতিটি ক্ষণে ক্ষণে দৃষ্টি রাখে সন্তানদের প্রতি। সময়মতো খাবার দেয়া, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সময়মতো যাবার জন্য তাগাদা দেয়া, ভাল বন্ধুবান্ধবদের সাথে সঙ্গ দেয়াসহ ছোটবেলা হতে বড়বেলা পর্যন্ত সার্বিক দায়িত্ব পালন করে থাকে। মাতা পিতার চাওয়া একটাই তারা যেন মানুষের মতো মানুষ হয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। বাবা-মায়ের প্রত্যাশা বৃদ্ধ বয়সে তাদের প্রতি সন্তানরা সুনজর রাখবে। সন্তানদের মা-বাবা যেভাবে ভালবাসা দেয়, বৃদ্ধ বয়সে তাঁরাও ভাল আচরণ ও দেখভাল করার প্রত্যাশা করে। সন্তানদের মাঝে এগুলো যখন খুঁজে না পায় তখন মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়ে অসহ্য যন্ত্রণায় হাবুডুবু খায় মা-বাবা। বুঝে উঠতে পারে না কি করবে এখন! সহ্যের বাঁধ ভেঙ্গে যখন চুরমার হয় জীবন, পাহাড়সম তিক্ততা পুঞ্জিভুত হয় তখন নিরুপায় হয়ে সিদ্ধান্ত নেয় বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রয় নিতে।

 

এমন বাস্তবতায় বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর (১৫ জুন) পালিত হয় বিশ্ব বয়স্ক নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস। দিবসটির লক্ষ্য প্রবীণদের প্রতি সহিংসতা, অবহেলা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে সচেতনতা সৃষ্টি এবং তাদের অধিকার, মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো।দিবসটি উপলক্ষে গত সোমবার(১৫ জুন) সামাজিক ও মানবিক সংগঠন রেসকিউ আওয়ার পিপল এভার (রোপ)-এর উদ্যোগে বগুড়ার শেরপুর উপজেলার জোয়ানপুর, গাড়ীদহে অবস্থিত সোনাভান বয়স্ক পূনর্বাসন কেন্দ্রে এক ব্যতিক্রমধর্মী আলোচনা সভা, মতবিনিময় ও মানবিক মিলনমেলার আয়োজন করা হয়।অনুষ্ঠিত এ অনুষ্ঠানে প্রবীণদের সঙ্গে সময় কাটান রোপের সাধারন সম্পাদক ও নির্বাহী পরিচালক তাহমিনা পারভীন শ্যামলী, সমাজসেবী রোকসানা আক্তার রাখি, সাওদা, দিনা ও শর্মি। তারা প্রবীণদের খোঁজখবর নেন, তাদের জীবনের অভিজ্ঞতা ও অনুভূতির কথা শোনেন এবং তাদের পাশে থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

 

আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, একজন প্রবীণ মানুষ তার সমগ্র কর্মময় জীবন পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণে ব্যয় করেন। অথচ বার্ধক্যে এসে অনেকেই অবহেলা, মানসিক নির্যাতন ও একাকীত্বের শিকার হন। বয়স্কদের প্রতি অবহেলা, উপেক্ষা কিংবা মানসিক কষ্ট দেওয়াও এক ধরনের নির্যাতন। তাই পরিবার ও সমাজের প্রতিটি মানুষের দায়িত্ব প্রবীণদের মর্যাদা ও সম্মানের সঙ্গে বাঁচার পরিবেশ নিশ্চিত করা।অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে রোপের নির্বাহী পরিচালক তাহমিনা পারভীন শ্যামলী আবেগঘন কণ্ঠে বলেন,

 

"আমি যখন সোনাভান বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রে আসি, তখন মনে হয় আমি আমার নিজের বাবা-মায়ের কাছেই এসেছি। এই মানুষগুলো সমাজের বোঝা নন, তারা আমাদের অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার। তাদের জীবনের গল্প, সংগ্রাম এবং না বলা কষ্ট আমাদের মানবিক হতে শেখায়।"তিনি আরও বলেন,"প্রবীণদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন অর্থ নয়, প্রয়োজন ভালোবাসা, সম্মান ও সময়। একজন বৃদ্ধ মা বা বাবা যখন কারও হাত ধরে একটু কথা বলতে পারেন, তখন তার চোখে যে আনন্দের ঝিলিক দেখি, সেটাই আমাকে বারবার এখানে টেনে আনে। তাদের একটি হাসি, একটি আন্তরিক দোয়া আমার সব ক্লান্তি দূর করে দেয়।

 

"অনুষ্ঠানে উপস্থিত প্রবীণদের অনুভূতিও ছিল হৃদয়স্পর্শী। ১০২ বছর বয়সী বাদশা প্রামাণিক বলেন, এখানে তিনি নিজের পরিবারের মতো সম্মান ও ভালোবাসা পান। মহিদুল ইসলাম (৬৫) জানান, সোনাভানে এসে তিনি একাকীত্ব ভুলে নতুন জীবনের স্বাদ পেয়েছেন। নিজাম উদ্দীন (৭০) ভাষায়, "এখানে কেউ আমাদের বোঝা মনে করে না, এটাই সবচেয়ে বড় পাওয়া।" অন্যদিকে রোশেনা বেগম(৭০) ও সফুরা খাতুন(৫৩) জানান, সোনাভান এখন তাদের নতুন পরিবার।

 

বক্তারা বলেন, বর্তমান সময়ে পারিবারিক বন্ধন অনেক ক্ষেত্রেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। ফলে অনেক প্রবীণ মানুষ নিঃসঙ্গ ও অবহেলিত জীবন কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে সোনাভান বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো মানবিক আশ্রয়স্থল হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।শুধু বিশ্ব বয়স্ক নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস পালনেই সীমাবদ্ধ নয়, রেসকিউ আওয়ার পিপল এভার (রোপ) দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন মানবিক ও সমাজকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছে। সংগঠনটি শীতার্ত মানুষের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ, অসহায় ও দুস্থদের চিকিৎসাসেবা, খাদ্য সহায়তা, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি, পরিবেশ সংরক্ষণে সচেতনতামূলক কার্যক্রম, দরিদ্র পরিবারের পাশে দাঁড়ানো, দুর্যোগকালীন সহায়তা প্রদান এবং বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে।

 

রোপের নেতৃবৃন্দ জানান, সমাজের অবহেলিত, সুবিধাবঞ্চিত ও অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফোটানোই তাদের মূল লক্ষ্য। বিশেষ করে প্রবীণ, নারী ও শিশুদের কল্যাণে সংগঠনটি ভবিষ্যতেও আরও ব্যাপক পরিসরে কাজ করতে চায়।অনুষ্ঠান শেষে প্রবীণদের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সময় কাটান অতিথিরা। তাদের হাসিমাখা মুখ যেন নতুন করে মনে করিয়ে দেয় প্রবীণরা কোনো বোঝা নন; তারা আমাদের শেকড়, আমাদের ইতিহাস, আমাদের অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার।বিশ্ব বয়স্ক নির্যাতন প্রতিরোধ দিবসে রোপের এই আয়োজন শুধু একটি দিবস পালন নয়, বরং মানবিক সমাজ গঠনের এক শক্তিশালী বার্তা প্রবীণদের ভালোবাসুন, সম্মান করুন, তাদের পাশে থাকুন। কারণ আজ তারা বৃদ্ধ, একদিন আমরাও সেই জায়গায় পৌঁছাবো।