নওগাঁয় মৌসুম শেষে নাবি জাতের আমে কৃষকের মুখে হাসি
নওগাঁ প্রতিনিধি
একসময় জুলাই পেরোলেই দেশের বাজার থেকে প্রায় বিদায় নিত দেশীয় আম। কিন্তু সময় বদলেছে। বদলেছে আম চাষের ধরণও। নওগাঁর বিস্তীর্ণ আমবাগানে এখন ভরা মৌসুম শেষে শুরু হচ্ছে আরেক নতুন মৌসুম। গাছে গাছে ঝুলছে গৌড়মতি, বারি আম-৪, আশ্বিনা ও কাটিমনের মতো দেরিতে পাকা নাবি জাতের আম। বাজারে অন্যান্য জাতের আমের সরবরাহ প্রায় শেষ হলেও এসব আমের চাহিদা রয়েছে তুঙ্গে। আর সেই চাহিদাকেই পুঁজি করে ভরা মৌসুমের তুলনায় চার থেকে পাঁচ গুণ বেশি দামে আম বিক্রি করছেন কৃষকরা। কয়েক সপ্তাহ আগেও যারা দাম নিয়ে হতাশ ছিলেন, তাদের মুখেই এখন ফুটে উঠেছে হাসি।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন, বাজারের চাহিদা এবং লাভজনক উৎপাদনের বিষয়টি বিবেচনায় নাবি জাতের ( বিলম্ব জাত ) আমই হতে পারে ভবিষ্যতের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় ফলচাষ। আর সেই সম্ভাবনার কেন্দ্রবিন্দুতে এখন দৃঢ়ভাবে নিজের অবস্থান তৈরি করেছে নওগাঁ। ভরা মৌসুমে দেশী জাতের আম পানির দরে বেচা-কেনা শুরু করলেও, সেই হতাশা পেছনে ফেলে নাবি জাতের আম আজ জেলার হাজারো কৃষকের মুখে ফিরিয়ে এনেছে স্বস্তি, আত্মবিশ্বাস এবং নতুন স্বপ্নের হাসি।
দেশের সবচেয়ে বড় আম উৎপাদনকারী জেলা নওগাঁয় এবার ৩০ হাজার ৩১০ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর জেলায় ৩ লাখ ৭৮ হাজার ২৫০ মেট্রিক টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আম বেচাকেনার সম্ভাব্য বাজারমূল্য ধরা হয়েছে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা। ইতোমধ্যে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার আম বিক্রি হয়েছে। একই সঙ্গে জেলার উৎপাদিত প্রায় ১ হাজার ১০০ মেট্রিক টন আম বিদেশে রপ্তানি হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারেও নওগাঁর আমের ক্রমবর্ধমান গ্রহণযোগ্যতার ইঙ্গিত বহন করে।
প্রতি বছর এপ্রিলের শুরু থেকে জুলাইয়ের মাঝামাঝি পর্যন্ত গোপালভোগ, হিমসাগর, ল্যাংড়া, আম্রপালি, নাকফজলি ও হাঁড়িভাঙাসহ জনপ্রিয় বিভিন্ন জাতের আম বাজারে আসে। এ সময় একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ আম বাজারজাত হওয়ায় সরবরাহ বেড়ে যায় এবং দাম কমে যায়। ফলে অনেক কৃষক উৎপাদন খরচ তুলতে পারলেও প্রত্যাশিত মুনাফা থেকে বঞ্চিত হন। তবে যেসব কৃষক পরিকল্পিতভাবে নাবি জাতের আমের বাগান গড়ে তুলেছেন, মৌসুমের শেষ ভাগে তারাই পাচ্ছেন সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সুবিধা।
নওগাঁর বিভিন্ন আমবাগান ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ বাগান থেকে আগাম ও মধ্যম মৌসুমের আম সংগ্রহ শেষ হলেও নাবি জাতের গাছে এখনও ঝুলছে পরিপক্ব ফল। বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ায় এসব আমের দাম প্রতিদিনই ভালো থাকছে। ভরা মৌসুমে যেখানে উন্নত মানের আমের দাম প্রতি মণ সর্বোচ্চ চার হাজার টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, সেখানে বর্তমানে গৌড়মতি, বারি আম-৪ ও অন্যান্য নাবি জাতের আম পাঁচ হাজার টাকা থেকে শুরু করে মানভেদে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১৫ হাজার টাকা থেকে ২৫হাজার পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।
জেলার সবচেয়ে বড় আমের মোকাম সাপাহার বাজার এখনও ক্রেতা-বিক্রেতার পদচারণায় মুখর। বর্তমান বাজারে গৌড়মতি আম মানভেদে প্রতি মণ ৬ থেকে ৮ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বারি - ৪ আম ও কাটিমনের দাম ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা। সীমিত পরিমাণে বাজারে আসা আম্রপালি বিক্রি হচ্ছে ২৪ থেকে ২৫ হাজার টাকা মণ এবং ব্যানানা ম্যাঙ্গোর দাম ১১ থেকে ১২ হাজার টাকা মণ। সরবরাহ কম হলেও উচ্চমূল্যের কারণে বাজারে প্রতিদিনই প্রাণচাঞ্চল্য বিরাজ করছে।
সাপাহার উপজেলার গোডাউনপাড়া এলাকার বরেন্দ্র এগ্রো পার্কের স্বত্বাধিকারী ও তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা সোহেল রানা জানান, বর্তমানে বাণিজ্যিক আমবাগানে আম্রপালির পর সবচেয়ে দ্রুত সম্প্রসারণ ঘটছে বারি আম-৪ ও গৌড়মতি জাতের। কারণ এ দুটি জাতের ফলন বেশি, বাজারমূল্য ভালো এবং কৃষকের লাভও উল্লেখযোগ্য। তাঁর ভাষায়, সাধারণ অনেক জাতের আম বিঘাপ্রতি ৪০ থেকে ৬০ মণ ফলন দিলেও বারি আম-৪ ও গৌড়মতি থেকে ৬০ থেকে ৮০ মণ পর্যন্ত ফলন পাওয়া যায়। গৌড়মতি বিক্রি শুরু হয় প্রায় পাঁচ হাজার টাকা মণ থেকে, আর মৌসুমের শেষ দিকে তা ১৫ হাজার টাকাও ছাড়িয়ে যায়। শীতকালে উৎপাদিত কাটিমন আমের দাম অনেক সময় ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা মণ পর্যন্ত ওঠে।
তবে গৌড়মতি চাষে কিছুটা বাড়তি যত্নের প্রয়োজন হয় বলেও জানান তিনি। রোগবালাইয়ের ঝুঁকি বেশি থাকায় প্রায় শতভাগ ফল ব্যাগিং করতে হয়। এতে বিঘাপ্রতি প্রায় ১০ হাজার টাকা অতিরিক্ত খরচ হয়। অন্যদিকে বারি আম-৪ চাষে তুলনামূলক কম ব্যয় হওয়ায় কৃষকদের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে।
কৃষি বিভাগের তথ্য বলছে, গত বছরের তুলনায় এ বছর গৌড়মতি আমের আবাদ বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ২৫০ হেক্টর। বারি আম-৪-এর আবাদ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৪৪৫ হেক্টরে। আশ্বিনা জাতের আবাদ হয়েছে ৩৫০ হেক্টরে। আর থাইল্যান্ডের জনপ্রিয় বারোমাসি জাত কাটিমনের আবাদ প্রায় তিন গুণ বেড়ে ৯৯৫ হেক্টরে পৌঁছেছে। চলতি মৌসুমে শুধু নাবি জাতের আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রাই ধরা হয়েছে ৭৫ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন।
জেলার কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) চাঁপাইনবাবগঞ্জ আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের বিজ্ঞানীরা ২০০৩ সালে বারি আম-৪ এবং ২০১২ সালে গৌড়মতি (বারি আম-১২) জাত উদ্ভাবন করেন। কাটিমন মূলত থাইল্যান্ডের একটি বারোমাসি আমের জাত। বছরের প্রায় সব সময়ই এ জাতের আম উৎপাদন সম্ভব হওয়ায় মৌসুমের বাইরেও বাজারে এর সরবরাহ থাকে এবং স্থানীয় ভোক্তাদের মধ্যে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।
অন্যদিকে, গৌড়মতি ও বারি আম-৪ সাধারণত জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত, অর্থাৎ প্রায় দুই মাস বাজারে পাওয়া যায়। এসব জাতের আম মৌসুমের শেষভাগে বাজারে আসায় আমপ্রেমীরা দীর্ঘ সময় ধরে দেশীয় আমের স্বাদ উপভোগ করার সুযোগ পান।
নওগাঁ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মনজুর রহমান বলেন, নাবি জাতের বা লেইট ভ্যারাইটি আম এখন কৃষকদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে উঠেছে। মৌসুমের তুলনায় এসব আম চার থেকে পাঁচ গুণ বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। ফলে কৃষকের আয় যেমন বাড়ছে, তেমনি দেশের আমের বাজারও দীর্ঘ সময় সচল থাকছে। আগে তিন মাসের মধ্যেই দেশীয় আমের মৌসুম শেষ হয়ে যেত। এখন নাবি ও বারোমাসি জাতের কারণে ছয় থেকে সাত মাস পর্যন্ত দেশীয় আম পাওয়া যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, নিরাপদ উৎপাদন, আধুনিক বাগান ব্যবস্থাপনা ও রপ্তানিযোগ্য মান নিশ্চিত করা গেলে নওগাঁর নাবি জাতের আম দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারেও আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে।