প্রণোদনার ফসলে ধানের মূল্য নিয়ে হতাশ কৃষক
নওগাঁ প্রতিনিধি
প্রণোদনা নির্ভর নওগাঁয় আউশ আবাদের ফলন ভাল হলেও ধানের দর নিয়ে হতাশ হয়ে পড়েছে কৃষক। উৎপাদিত ধানে কাঙ্ক্ষিত দাম পাচ্ছেন তারা। ধান বিক্রি করে উৎপাদন খরচও উঠছে না বলে জানিয়েছেন তারা। চলতি মৌসুমে জেলার হাট গুলোতে প্রকারভেদে প্রতি মন ধান ৯০০ থেকে ১০০০ টাকা মন দরে বিক্রি হচ্ছে। যা গত বছরের তুলনায় ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা কমে বিক্রি হচ্ছে।
একদিকে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে ধানের বাজারদর কমছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ঋণের চাপ, পারিবারিক ব্যয় ও পরবর্তী আমন চাষের প্রস্তুতির খরচ। ফলে আউশের ধান ঘরে উঠলেও কৃষকের মুখে হাসি নেই।
কৃষকদের দাবি, শুধু উৎপাদন বাড়ানো নয়, উৎপাদিত ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করাও জরুরি। তা না হলে মাঠে বাম্পার ফলনের পরও কৃষকের মুখে হাসি ফিরবে না। বাজার ব্যবস্থাপনায় কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে সামনে আমন মৌসুমেও একই সংকট আরও প্রকট হওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা
জেলার বিভিন্ন ধানের হাট ঘুরে দেখা গেছে, জিরাশাইল, কাটারি ও বিআর-২৮ জাতের ধান বর্তমানে প্রতি মণ ৯০০ থেকে ৯৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। কোন কোন ধান ১০০০ টাকা মন দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে।
কৃষকদের ভাষ্য, গত বছরের তুলনায় এবার জাতভেদে প্রতি মণ ধানের দাম কমেছে প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা। বিপরীতে বেড়েছে চাষাবাদের ব্যয়। সার, বীজ, সেচ, কীটনাশক, জমি প্রস্তুত এবং শ্রমিকের মজুরি সব মিলিয়ে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। ফলে ভালো ফলন পেয়েও লাভের মুখ দেখা তো দূরের কথা, অনেক কৃষককে মূলধন হারানোর আশঙ্কায় ধান বিক্রি করতে হচ্ছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত মৌসুমে নওগাঁয় ৫১ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে আউশ ধানের আবাদ হয়েছিল। বোরো ও আমন চাষাবাদের মধ্যবর্তী সময়ে আউশ আবাদ বৃদ্ধির লক্ষে প্রতিবছর সরকার কৃষকদের কৃষি প্রণোদনার (ভর্তুকির) সার,বীজ (বিনামূল্যে) সরবরাহ করে আসছে। চলতি মৌসুমে সরকার কৃষি বিভাগের মাধ্যমে নওগাঁয় ৬৬ হাজার কৃষককে কৃষি প্রণোদনা দিয়েছে। প্রত্যেক কৃষককে ৫ কেজি বীজ,১০ কেজি ডিএপি(ফসফেট) ও ১০ কেজি এমওপি(পটাশ) দেওয়া হয়েছে। টাকার অংকে প্রতি কৃষক ৭৬৭.৫০ টাকার কৃষি উপকরণ পেয়েছে। সেই আলোকে জেলায় মোট ব্যায় হয়েছে ৫ কোটি ৬ লাখ ৫৫ হাজার টাকা। সেই তুলনায় আউশ আবাদের বিস্তৃতিও বেড়েছে। জেলায় এবার আবাদ বেড়ে হয়েছে ৫৮ হাজার ৪৭৩ হেক্টর। কৃষি বিভাগের হিসাবে, প্রতি একর জমিতে আউশ ধান উৎপাদনে গড়ে বিঘাপ্রতি খরচ হয়েছে ১৯০০০ থেকে ২০ হাজার টাকা।
কৃষকদের হিসাবে চিত্রটি আরও কঠিন। এবার এক বিঘা জমিতে গড়ে ১৭ থেকে ১৮ মণ ধান পাওয়া যাচ্ছে। বর্তমান বাজারদরে প্রতি মণ ৯০০ থেকে ১০০০ টাকা হিসাবে বিক্রি করলে এক বিঘা জমির ধান থেকে কৃষকের আয় হচ্ছে প্রায় ১৬ থেকে ১৮ হাজার টাকা। অর্থাৎ, ধানের ফলন ভালো হলেও বিক্রির টাকায় অনেকের উৎপাদন খরচই উঠছে না।
রাণীনগর উপজেলার ভিটি গ্রামের কৃষক মিলন হোসেন আবাদপুকুর হাটে ধান নিয়ে এসেছিলেন। তিনি বলেন, ধানের দাম খুব কম। এই দামে ধান বিক্রি করলে চাষের খরচই উঠবে না। কিন্তু সংসারের খরচ আছে। তাই বাধ্য হয়েই কম দামে ধান বিক্রি করতে হচ্ছে।
মহাদেবপুর উপজেলা সদরের বৃহৎ ধানের হাটে ১০ মণ জিরাশাইল ধান নিয়ে এসেছিলেন শোভাপুর গ্রামের কৃষক করিম মন্ডল। তিনি বলেন প্রতি মণ ধান ৯০০ টাকা দরে বিক্রির কথা বলছিল। ধান বাজারে আনতেই পরিবহন খরচ হয়েছে। এখন ধান বিক্রি না করে বাড়ি নিয়ে গেলে আবার ভাড়া দিতে হবে। তাই বাধ্য হয়ে প্রতি মণ ৮৮০ টাকা দরে ১০ মণ ধান বিক্রি করেছি। অথচ গত বছর একই ধান ১৩০০ থেকে ১৪০০ টাকা মণ দরে বিক্রি করেছিলাম।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ধান কাটার পরপরই তাঁদের সামনে একসঙ্গে কয়েকটি আর্থিক চাপ এসে পড়ে। কারও ঋণের কিস্তি দিতে হয়, কারও জমির বর্গার টাকা পরিশোধ করতে হয়। আবার সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতেও ধান বিক্রির অর্থের ওপর নির্ভর করতে হয়। ফলে বাজারদর পছন্দ না হলেও অনেক কৃষকের হাতে ধান ধরে রাখার সুযোগ নেই।
বদলগাছী উপজেলার মিঠাপুর গ্রামের কৃষক আকরাম হোসেন চার বিঘা জমি বর্গা নিয়ে আউশ আবাদ করেছেন। চাষের জন্য সমিতি থেকে ঋণও নিয়েছেন তিনি। তিনি বলেন, চার বিঘা জমিতে আউশ চাষ করতে তাঁর প্রায় ৬০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। কিন্তু ধানের দাম কমে যাওয়ায় ঋণের টাকা পরিশোধ এবং সংসারের ব্যয় মেটানো নিয়ে তিনি এখন দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।
নওগাঁ মহাদেবপুর এলাকার ধান ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম বলেন বর্তমানে ধানের বাজার নিম্নমুখী। আউশ ধান বাজারে আসার পর থেকেই দর কমতে শুরু করেছে। দেড় সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতি মণ ধানের দাম ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত কমেছে। তিনি বলেন, বর্তমানে কাটারি ধান প্রতি মণ ৯০০ থেকে ১০০০ টাকা, জিরোশাইল ৮৫০ থেকে ৯০০ টাকা এবং বিআর-২৮ জাতের ধান ৮২০ থেকে ৮৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। অর্থাৎ কৃষকের উৎপাদন খরচ যখন ঊর্ধ্বমুখী, ঠিক তখনই তাঁর উৎপাদিত পণ্যের বাজারদর নেমে গেছে। এতে সবচেয়ে বেশি চাপ পড়ছে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের ওপর।
নওগাঁ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মনজুর রহমান বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৬৬ হাজার কৃষককে কৃষি প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। ফলে গত বছরের চেয়ে প্রায় ৯ হাজার হেক্টর বেশী জমিতে আউশ আবাদ হয়েছে। ধানের ফলনও ভাল হয়েছে। বর্তমানে যে দামে ধান বিক্রি হচ্ছে,তা কাঁচা ধান প্রায় ৩০ ভাগ ময়েশ্চারযুক্ত। এই ধান শুকিয়ে ধরে রাখতে পারলে প্রতিমন ধান ১৪০০ থেকে ১৫০০ টাকা মন দরে বিক্রি করতে পারবে কৃষকরা।
এদিকে কৃষকের কাছ থেকে ধান কম দামে কেনা হলেও স্থানীয় চালের বাজারে এর সরাসরি কোনো প্রভাব দেখা যাচ্ছে না। নওগাঁর বিভিন্ন বাজারে মোটা ও সরু জাতের চাল আগের দামেই বিক্রি হচ্ছে। ফলে উৎপাদন পর্যায়ে ধানের দর কমলেও সেই সুবিধা ভোক্তার পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে না।
অপরদিকে চালকল মালিকদের দাবি, গত বোরো মৌসুমে দেশে ধানের ভালো উৎপাদন হয়েছে। এর পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ চাল আমদানি হওয়ায় বাজারে পর্যাপ্ত চালের মজুত তৈরি হয়েছে। এতে দেশীয় চালের চাহিদা কমেছে। করপোরেট পর্যায়েও চাল বিক্রি কমে যাওয়ায় মিলাররা ধান কেনার পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছেন। তাই আউশ ধান কেনার প্রতিযোগিতা নেই।
নওগাঁ জেলা চালকল মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেন চকদার বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিপুল পরিমাণ চাল আমদানি করা হয়েছে। এর ফলে দেশে উৎপাদিত চালের চাহিদা কমেছে। সামনে আমন মৌসুমও রয়েছে। পরিস্থিতি এমন থাকলে আমন মৌসুমেও কৃষকরা ধানের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।
তিনি বলেন, নওগাঁর কৃষকের কাছে ভালো ফলন সাধারণত আশীর্বাদ হিসেবে আসে। কিন্তু উৎপাদনের পর বাজারে ন্যায্য দাম না মিললে সেই ফলনই হয়ে ওঠে লোকসানের কারণ। এবার আউশে ঠিক সেই বাস্তবতার মুখোমুখি তারা।