পুতুল থেকে দেশমাতা হয়ে ওঠার গল্প
অধ্যাপক ডা. মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল
বাংলাদেশের আকাশ কদিন থেকেই ধূসর। সূর্যের দেখা নেই চার পাঁচ দিন। এভারকেয়ার হাসপাতালের আইসিইউ তে তখন গভীর রাতের নিস্তব্ধতা, ম্যাডাম খালেদা জিয়ার কোনার বেডটা আলো আধারীর মায়ার খেলায় এক অপার্থিব পবিত্রতায় জড়ানো । শৈশব থেকে পৌঢ়তার সব স্মৃতিগুলো যেন আজ প্রকাশিত হবার আকাঙ্ক্ষায় অস্থির। মনিটরের সবুজ রেখাগুলো আজ সকাল থেকেই বার বার এলোমেলো। মনিটরের এ্যলার্ম বার বার জানান দিচ্ছে সময় আর বেশি নেই। শীতের তীব্রতায় অসার করা ভোঁতা অনুভূতিগুলো বুঝতেও পারছে না কি মর্মান্তিক সত্যি গুটিসুটি মেরে এগিয়ে আসছে এক ভয়ানক খবর হয়ে।
দিনাজপুর শহরের বালুবাড়ীর তৈয়বা ভিলার সামনের ছোট্ট সবুজ লনে এক্কাদোক্কা খেলা কিশোরী পুতুল জীবনের বর্নিল আটটা দশক পেরিয়ে আজ অসার শুয়ে আইসিইউ র কোনার বিছানায়।
দিনাজপুরে কর্মরত কেতাদুরস্ত ক্যাপ্টেন জিয়ার চোখে এমন গভীর ভাবে আটকে যাবেন কে জানতো। স্কুলের গন্ডি পেরোতে না পেরোতেই বন্দী লাল বেনারসিতে।
১৯৬৫ তে যুদ্ধ শুরু ভারত পাকিস্তানের। কিসের যুদ্ধ আর কেনই বা যুদ্ধ সেটা তেমন না বুঝলেও পশ্চিম পাকিস্তানের সেনা কোয়ার্টারে যুদ্ধের পুরোটা সময় একাকী কাটিয়েছেন যুদ্ধে যাওয়া স্বামীর মঙ্গল কামনায়।
ভীষণ রাশভারি, স্বল্প ভাষী স্বামী, ভালোবাসার উচ্চারণে প্রগলভ নয় কিন্তু ভীষণ অন্তর ছোঁয়া। সংসারে নেই কোন বাহুল্য আর প্রাচুর্যের ছোঁয়া শুধু আছে সততা আর ভালোবাসার গর্ব।
দিনাজপুরের ছোট্ট বাড়ীটা বার বার হাতছানি দেয় হাজার মাইল দূর থেকে। আকাঙ্খার বদলির খবরে আকাশ ছোঁয়া আনন্দ নিয়ে হঠাৎই জন্মভূমিতে ফেরত। ততদিনে কোলজোড়া তারেক- আদরের ছোট্ট পিনো আর পরপরই আরেক ছোট্ট সোনা আরাফাত ৷
সবাই তখন চট্টগ্রামে, একাত্তরের শুরু দেশ জুড়ে আন্দোলন দিয়ে। স্বামী তখন তরুণ মেজর, সারা দেশের মত বাড়ীর আবহাওয়াও বেজায় থমথমে।
পঁচিশে মার্চের বিকেল তখন, হন্তদন্ত হয়ে বাসায় স্বামীর খোঁজে তার ইউনিটের এক সৈনিক। বাসায় নেই শুনে ফিরে যাবার মুহূর্তে হঠাৎই কৌতুহলী প্রশ্ন, কি হয়েছে? "ক্যান্টনমেন্ট থেকে পাকিস্তানি অফিসার এসেছে আমাদের সব অস্ত্র নিয়ে যেতে, সেটাই জানাতে"। এসব বিষয়ে কোন দিনই নাক না গলানো খালেদা হঠাৎই নিজের অজান্তেই বলে ফেললেন, "স্যারকে না বলে ওগুলো দেবেন না।" সেদিন পাকিস্তানিরা অস্ত্রগুলো নিতে পারেনি।
সে রাতে স্বামী ঘরে ফেরেন নি। খবর পেলেন, সারাদেশে পাকিস্তানিরা আচমকা ঝাপিয়ে পড়েছে নিরীহ দেশবাসীর উপর, শুরু হয়েছে নির্বিচার হত্যাকান্ড। শুনলেন রেজিমেন্টে বিদ্রোহ হয়েছে, নেতৃত্ব দিচ্ছেন তাঁরই স্বামী।
পরদিন রেডিওতে শুনলেন তাঁর স্বামী বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন। এত কাছে থেকেও জানতে পারেন নি যে মানুষটা এমন কিছু একটা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। একদিকে গর্ব হচ্ছে অকল্পনীয়, আবার সাথে সাথেই ভয়ে আতঙ্কে শিউরে উঠছেন। এখন আর ফেরার পথ নেই, পরাজয় মানেই নিশ্চিত মৃত্যু। হালকা অভিমান মনের কোনায় এলেও সামাল দিলেন। একবার বলে গেলে কি হোত ? তারেক - আরাফাত তখন গভীর ঘুমে। মাসের শেষ, হাতে তেমন টাকাও নেই। খবর পাচ্ছিলেন, স্বামীর বাহিনী কালুরঘাটে লড়ছেন শত্রুর বিরুদ্ধে। মেজর জিয়া তখন সারাদেশে সবচেয়ে পরিচিত নাম, আর সাথে সাথে দেশের সবচাইতে বিপদগ্রস্ত মানুষ হোল এই তিন জন। যাদের দুজনের বিপদ কাকে বলে বুঝবার ক্ষমতাই নাই আর আরেক তরুণী সেই দুই ছোট্ট শিশুদের নিয়ে পরিজন থেকে শত মাইল দূরে। আর এটাও বুঝতে পারলেন একমাত্র দেশ স্বাধীন হলেই স্বামীর দেখা পাবেন নইলে আর কোনদিনই নয়।
শুরু হোল গন্তব্যহীন অজানা যাত্রার আজ এখানে তো কাল আরেক জায়গায়। এভাবে আর কতদিন, জুলাইয়ে একদিন ধরা পড়লেন পাকিস্তানিদের হাতে, সবাই একসাথে। ঢাকা সেনানিবাসে বন্দী রইলেন দুই শিশু পুত্রকে নিয়ে ডিসেম্বরের বিজয় অব্দি ।
১৬ ডিসেম্বরে এলো সেই বহু আকাঙ্ক্ষার বিজয়, ঘরে ফিরলেন জেড ফোর্স অধিনায়ক জিয়া। কষ্টের নয় মাস তাদের কেমন কেটেছে সেটাও বলার সময় যেমন হোল না তেমনি শোনাও হলো না যুদ্ধের বীরত্ব গাঁথা। তেলিয়াপাড়ায় সেক্টর কমান্ডারদের মিটিং, কামালপুরের যুদ্ধ, মুক্তাঞ্চল রৌমারী, সিলেটের সালুটিকর আর শমসেরের নগরের যুদ্ধ, বিজয়ের দুই দিন আগে সিলেট মুক্ত করার গল্প, যমুনার চর - চা বাগানের খোলা আকাশের নীচে রাতের পর রাত কাটানোর গল্পগুলোও শোনা হলো না আসল বীরের নিজ কন্ঠে।
যোগ্যতা আর প্রাপ্যতা থাকা সত্বেও সেনা প্রধান না হওয়ার কোন আক্ষেপ শুনলেন না স্বামীর কাছে। কুমিল্লা হয়ে ঢাকায় এলেন সেনা বাহিনীর উপ প্রধানের স্ত্রী হয়ে। সময় গড়ালো নিজের মত, দেশে তখন নিদারুণ দুর্ভিক্ষ, প্রতিদিনই অনাহারে মৃত্যুর খবর আসে। চারিদিকে একটা পরিবর্তনের গুমোট বাতাবরণ। ১৯৭৫ এর আগস্ট - নভেম্বর দেশকে এক নতুন ক্রান্তিকালে দাঁড় করিয়ে দিল। স্বামীর কাছে শেষ আগস্টে সেনাপ্রধানের দায়িত্ব এলেও নভেম্বরই কিছু বুঝে ওঠার আগেই পুরো পরিবার গৃহবন্দী হলো খালেদ মোশাররফ বাহিনীর হাতে। পুরো পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন এক অনিশ্চিত দিন গননা। হঠাৎই দেখলেন সৈনিকদের গগনবিদারী উল্লাসে আর বিজয় আনন্দে স্বামীকে একরকম কাঁধে করে সৈনিক জনতার নেতৃত্বের আসনে। একাত্তরের মত আরেক ক্রান্তিলগ্নে জাতির দিশারি জিয়াউর রহমান। এরপর সেনা প্রধানের স্ত্রী প্রেসিডেন্টের স্ত্রী, তাতে কি? সবসময়ই রইলেন পাদপ্রদীপের আড়ালে। স্বামীর সময় কাটে দেশের কাজে, অসম্ভব জনপ্রিয় স্বামীর গল্পগাথা মানুষের মুখে মুখে ফেরে কিন্তু নিজে সেটার অংশ হতে পারেন না। আটপৌর গৃহবধূর জীবন কাটে সন্তানদের নিয়ে। প্রেসিডেন্টের খাবার টেবিল আলোকিত হয় রেশনের মোটা চালের বিকর্ষক গন্ধ, সব্জি -ডাল, ছোট মাছ আর কদাপি মুরগীর ঝোলে। ছেলেদের সন্তুষ্ট থাকতে হয় বাবার পুরনো শার্ট প্যান্ট নিজেদের মাপে মানানসই করে বানিয়ে।
মাঝে মাঝে রাস্ট্রীয় প্রটোকলে বাধ্য হয়ে জনসমক্ষে যেতে হয়, বরাবরের মত সলজ্জ নিরাভরণ কিন্তু সেই স্নিগ্ধ সৌন্দর্যের অপরুপ ঔজ্জ্বল্যের দ্যুতি ছাপিয়ে যায় সবকিছু।
একাশির ২৯ মে সকালে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছেন, রাতে জিয়া ফোনে জানিয়েছেন ফিরছেন সকালেই। কিন্তু সেই প্রত্যাবর্তনের সকাল