| প্রচ্ছদ

আমের সঙ্গে ফরমালিনের কি কোনো সম্পর্ক আছে?

পুণ্ড্রকথা ডেস্ক
পঠিত হয়েছে ৫৩ বার

চলছে আমের মৌসুম। বাজারে প্রতিনিয়ত আসছে নতুন নতুন প্রজাতির আম। কিন্তু অনেক সময় আমরা আমের সঙ্গে ফরমালিনের একটা যোগসূত্র স্থাপন করে ফেলি। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে কৃষি গবেষণায় আমের সঙ্গে ফরমালিনের কোন সম্পর্কই পাওয়া যায়নি। কৃষিবিদরা বলছেন, দেশের উদীয়মান এই শিল্পকে বাঁচাতে বুঝে-শুনে মন্তব্য করা প্রয়োজন।

ফরমালিন কী?

ফরমালডিহাইড বা মিথান্যাল এক ধরনের রাসায়নিক যৌগ। বর্ণহীন ও দুর্গন্ধযুক্ত গ্যাস হিসেবে এর সবিশেষ পরিচিতি রয়েছে। এটি আগুনে জ্বলে এবং বিষাক্ত পদার্থবিশেষ। এর রাসায়নিক সংকেত হচ্ছে CH₂O। বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ফরমালডিহাইড পানিতে দ্রবীভূত অবস্থায় সচরাচর এটি ফরমালিন নামে পরিচিত হয়ে থাকে।

ফরমালিন কী কাজে ব্যবহার হয়?

এটি বায়োলজিক্যাল এবং এনাটমিক্যাল নমুনা সংরক্ষণের জন্য ব্যবহার হয়। এটি সার্জিক্যাল যন্ত্রপাতি পরিশোধনের জন্যও এন্টিস্যাপটিক হিসাবে ব্যবহার হয়।

এটি মানব দেহের জন্য কি ক্ষতিকর?

ফরমালডিহাইড অত্যন্ত বিষাক্ত সিস্টেমিক উপাদান যেটা শ্বাস-প্রশ্বাসের মধ্যমে শরীরের ভিতরে ঢুকে যায়। এটি শ্বাস-প্রশ্বাসের এরিয়া ত্বককে জ্বালা-পোড়া করায়, অনেক সময় সাফোক্যাসন বা অক্সিজেনের অভাব তৈরি করে।

ফরমালিনের গন্ধ কেমন? ফরমালডিহাইড হল রং বিহীন গ্যাস যার ভীষণ সাফোক্যাটিং গন্ধ আছে। যেটা প্রায় অ্যালকোহলের সঙ্গে মিশে তরল পদার্থ তৈরি করে সেটাকে ফরমালিন বলে। ফরমালডিহাইড মূলত জীবাণু ধ্বংস করে ও ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকের আক্রমণ থেকে বাণিজ্যিক প্রোডাক্টগুলোকে রক্ষা করে। ফরমালডিহাইড পরিবেশে জমা হয় না, কারণ এটা মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে, সূর্যের আলোর উপস্থিতে অথবা মাটির ও পানির ব্যাকটেরিয়ার সাহায্যে ভেঙ্গে যায়। ফরমালডিহাইড ভেঙ্গে ফরমিক এসিডে পরিণত হয়, ফলে এটা মানব শরীরে সহজে প্রবেশ করে না।

আম চাষিরা ফরমালিন ব্যবহার করেন না

আম চাষিরা আম সংরক্ষণের জন্য কখনই ফরমালিন ব্যবহার করে না, তারা সাধারণত অন্যান্য কেমিক্যাল ব্যবহার করে। যেমন ইথেফন। তাছাড়া প্রকৃতিগতভাবে পরিপক্ব আমে ১.২২ থেকে ৩.০৮ পিপিএম ফরমালিন তৈরি হয়। পিপিএম ('Parts Per Million) অর্থাৎ ১০ লক্ষ ভাগের এক ভাগ। ইথেফন হল এক ধরণের PGR অর্থাৎ প্লান্ট গ্রোথ রেগুলেটর। ইথেফনের ব্যবহার গাছের এক জাত থেকে অন্য জাতে ভিন্ন হয়। গাছের ভিন্ন গ্রোথ সময়ে ইথেফনের ঘনত্ব ও ব্যবহারের সময় ভিন্ন হয়। এটা গাছে স্প্রে অথবা কুয়াশার মত ব্যবহার করা হয়, যা গাছের পত্ররন্ধ্রর মধ্যমে ভিতরে ঢুকে ডিকোম্পস হয়ে ইথিলিন তৈরি করে।

ইথিলিন প্রকৃতিগতভাবে একটি প্লান্ট হরমোন যা অনেক ফল ও সবজীতে তৈরি হয়। ইথিলিন গাছের শরীর প্রসেস প্রক্রিয়ায় কাজ করে। পাশাপাশি ফল পাকার প্রসেসকে বাড়ায় ইথিলিনের ইন্টারনাল ঘনত্বকে বাড়ানোর মাধ্যমে এবং এর রেঞ্জ হলো ০.১ থেকে ১.০ পিপিএম। অনেকে ফল পাকানোর গতিকে ত্বরান্বিত করার জন্য ফলের ওপরে প্রয়োগ করে, তবে এটার নিরাপদ রেঞ্জ হলো ০.০০১ থেকে ০.০১% পর্যন্ত যা ফসল, জাত ও পরিপক্বতার ওপর নির্ভর করে। তবে যে কোন ফল খাওয়ার আগে বেসিনের পানিতে কয়েক মিনিট ছেড়ে রাখলে ক্যামিকাল ধুয়ে চলে যায়, ফলে শরীরের ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে না বললেই চলে। তাই আসুন ইথেফন, ইথিলিন ও ফরমালিনের বিষয়টি ভালোভাবে জানি এবং আম না কেনা বা ধ্বংস করা থেকে বিরত থাকি।

তবে কার্বাইড শরীরের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। যার কারণে নানারকম রোগ হতে পারে। যেমন- ক্যানসার, কিডনি ও লিভারের সমস্যা দেখা দিতে পারে। সরকারের ব্যাপক সচেতনতামূলক প্রচারণার ফলে ইদানীং কার্বাইডের অনেক কমে গেছে। তারপরও কিছু কাজ আমরা করতে পারি। যেমন- স্থানীয় এলাকায় মাইকিং করা, লিফলেট ও পোস্টার বিতরণ করা, আম চাষিদের নিয়ে সচেতনতামূলক মিটিং করা, ইনফোকাস মিটিং করা, আড়তদার নিয়ে মিটিং করে বুঝানো ইত্যাদি কার্যক্রম চালানো।

আমাদের ৩০ লাখের মত আম গাছ আছে। যা প্রায় ৩২ হাজার হেক্টর জমিতে চাষ হয়। আম চাষে পৃথিবীতে আমাদের অবস্থান সপ্তম। সারা বছর প্রায় ১০ লক্ষ মেট্রিক টন আম উৎপাদন হয়। যার মূল্য প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা। আম চাষের সঙ্গে বহু মানুষের জীবন জীবিকা নির্ভর করে। আমরা যদি একটু সচেতন হই তাহলে আমাদের এই সম্ভাবনাময় শিল্পকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যেতে পারি। দেশের চাহিদা মিটিয়ে উন্নত দেশে রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারি। তাই আসুন আমরা সবাই একটু সচেতন হই, ভালোভাবে বুঝে, সঠিকভাবে শুনে মন্তব্য করি এবং এই বিশাল শিল্পকে ভুল বোঝাবুঝির হাত থেকে রক্ষা করে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাই।

লেখক: কৃষিবিদ মো: আববাস আলী, পরিচালক, সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং, ম্যানেজিং পার্টনার, এক্সপ্লোর বিজনেস লিমিটেড।

মন্তব্য