শত বঞ্চনাকে পেছনে ফেলে ঘুরে দাঁড়িয়েছে বগুড়া
বিশেষ রিপোর্ট :
[প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল বগুড়ায় গড়ে তোলা হবে ভারি শিল্প। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কর্মসংস্থান হবে শত শত মানুষের। এ জন্য ৩৭ বছর আগে সরকারিভাবে জমিও অধিগ্রহণ করা হয়। শেষ পর্যন্ত সেটি আর হয়নি। ভারি শিল্পের জমিতে হয় ফসলের আবাদ। শুধু কি তাই? মালিক পক্ষের অব্যবস্থাপনা এবং বিভিন্ন সময়ে সরকারগুলোর অসহযোগিতার কারণে গেল শতাব্দীর ষাটের দশকে প্রতিষ্ঠিত কল-কারখানাগুলোও একে একে বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে প্রতিশ্রুতি এলো মহিলাদের জন্য আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলার। কিন্তু বড় বিমান ওঠা-নামার সুযোগ না থাকার অজুহাত তুলে সেটিও আর হলো না।পাইপ লাইনে গ্যাস এলেও শিল্পখাতে ব্যবহারের তেমন সুযোগ মেলেনি। জনতার দাবির মুখে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে ঘোষণা এলো নির্মিত হবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। গড়ে তোলা হবে অর্থনৈতিক অঞ্চল। বসবে বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ রেলপথ। কিন্তু সেগুলো এখনও কাগজে কলমেই থেক গেল। তবে তাই বলে বগুড়বাসী বিশেষত এখানর উদ্যোক্তারা কিন্তু বসে থাকেননি। বরং শত বঞ্চনাকে পেছনে নানা ক্ষেত্রে এগিয়ে চলেছে। শিল্প-বাণিজ্য এবং শিক্ষা ক্ষেত্রে বগুড়ার অর্জন গর্ব করার মত।
পুণ্ড্রকথা তার পাঠকদের কাছে সে অর্জনের কথা ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরতে চায়। এটা প্রথম কিস্তি।]
গেল শতাব্দীর ষাটের দশকে ‘শিল্পনগরী’ হিসেবে খ্যাত বগুড়ায় মাঝে অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেলেও হালে নতুন নতুন কলকারখানা গড়ে উঠছে। অঞ্চল ভিত্তিক ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের প্রসারের পাশাপাশি জেলার প্রতিটি সড়ক-মহাসড়কের পাশে গড়ে উঠছে বড় বড় কলকারখানা। প্রতি বছর অসংখ্য নারী-পুরুষ যুক্ত হচ্ছেন এসব শিল্প প্রতিষ্ঠানে। শুধু শহরেই নয়, শিল্পায়ন হচ্ছে গ্রামাঞ্চলেও। বিপুল অংকের পুঁজি বিনিয়োগের কারণে জেলার অর্থনীতিও এখন বেশ চাঙ্গা। স্থানীয় চেম্বার নেতৃবৃন্দ, উদ্যোক্তা, শিল্প মালিক ও ব্যাংক কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ২০০০ সালের পর থেকে গত প্রায় দেড় দশকে বগুড়ায় শিল্পখাতে অন্তত ৩ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়েছে। যার সিংহভাগের যোগান এসেছে সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে। এসব কলকারখানায় উৎপাদিত বেশ কিছু পণ্য বিদেশেও রপ্তানী হচ্ছে। যার পরিমাণ বছরে সোয়া কোটি মার্কিন ডলার বা ১০০ কোটি টাকা টাকা।
শিল্পখাতে বগুড়ার ইতিবাচক পরিবর্তনের চিত্র সরকারি পরিসংখ্যানেও উঠে এসেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) বগুড়া জেলার অর্থনৈতিক শুমারি-২০১৩ প্রতিবেদন অনুযায়ী এ জেলায় কুটির শিল্প, মাইক্রো শিল্প, ক্ষুদ্র শিল্প, মাঝারি এবং বৃহৎ ধরনের মোট ১ লাখ ২ হাজার ৮০৬টি শিল্প প্রতিষ্ঠান রয়েছে। অথচ ২০০৩ সালে বগুড়ায় মোট শিল্প প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ৬৮ হাজার ৬৮৩টি। সেই হিসাবে এক দশকে জেলায় উল্লেখিত পাঁচ ধরনের মোট ৩৪ হাজার ১২৩টি নতুন কলকারখানা নির্মিত হয়েছে। তবে স্বাধীনতার পূর্বে বগুড়ায় শিল্প প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল মাত্র ১ হাজার ৫৪২টি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে স্বাধীনতার পর এ জেলায় ২০০০ সাল থেকে ২০০৯ সালের মধ্যেই সবচেয়ে বেশি ৫৬ শতাংশ শিল্প গড়ে উঠেছে।
২০১৬ সালের ২৯ ডিসেম্বর প্রকাশিত বিবিএস-এর বগুড়া জেলার সর্বশেষ অর্থনৈতিক শুমারি প্রতিবেদন অনুযায়ী বগুড়া জেলায় গড়ে ওঠা মোট কলকারখানার মধ্যে ৭৮ শতাংশই কুটির শিল্প। এ জেলায় কুটির শিল্প রয়েছে ৮০ হাজার ৬৭২টি। এছাড়াও মাইক্রো শিল্প রয়েছে ২ হাজার ৬২২টি, ক্ষুদ্র শিল্পের সংখ্যা ১৯ হাজার ৩০৩টি, মাঝারি শিল্প ১৩০টি এবং বাদবাকি ৭৯টি বৃহৎ ধরনের শিল্প। শহরের চেয়ে গ্রামাঞ্চলেই কলকারখানার সংখ্যা বাড়ছে। বিবিএস-এর শুমারি প্রতিবেদন বলছে, বগুড়ায় গড়ে ওঠা মোট শিল্প কলকারখানার মধ্যে ৬৫ শতাংশ বা ৬৬ হাজার ৯৯২টি প্রতিষ্ঠানই গড়ে উঠেছে গ্রামাঞ্চলে। বাদবাকী ৩৫ হাজার ৮১৪টি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে শহরে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, গেল দেড় দশকে অর্থাৎ ২০০০ সাল থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে বগুড়ায় ব্যক্তি উদ্যোগে বড় যেসব শিল্প গড়ে উঠেছে সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: জুটমিল, পেপার মিল, রাইস ব্রান অয়েল মিল, অটো রাইস মিল, অটো ব্রিকস্, টাইলস্ কারখানা, ফ্লাওয়ার মিল, ওয়েল মিল, ওষুধ কারখানা, সেচ যন্ত্র প্রস্তুতকারক ফাউন্ড্রি ইন্ডাস্ট্রি কলকারখানায় ব্যবহৃত যন্ত্র এবং যন্ত্রাংশ প্রস্তুতকারক লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ও মেটাল ইন্ডাস্ট্রি । রয়েছে পোল্ট্রি খাতের ফিডমিল এবং স্পেশালাইজড্ কোল্ড স্টোরেজও। অঞ্চল ভিত্তিক গড়ে ওঠা কুটির শিল্পের মধ্যে রয়েছে চিকন সেমাই ও লাচ্ছা সেমাই কারখানা, দইয়ের কারখানা, নাইলনের ব্যাগের কারখানা, সিমেন্টের খুঁটি ও কাঁচের শিশি তৈরির কারখানা, সোয়েটার কারখানা, রিকশার পার্টস সংযোজন কারখানা, প্লাস্টিকের খেলনা তৈরির কারখানা, হ্যাচারী, মুরগীর খামার, ছাপাখানা, ব্রেড ও বিস্কুট ফ্যাক্টরী, মাদুর শিল্প, টুপি শিল্প ও তাঁত শিল্প। এসবের পাশাপাশি শহরে নির্মিত হয়েছে তারকা খচিত একাধিক হোটেল-মোটেল এবং গড়ে উঠেছে একাধিক আবাসন প্রতিষ্ঠান।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সস্তা শ্রম এবং শিল্প স্থাপনে জমির সহজ লভ্যতার কারণেই বগুড়ায় শিল্পায়নের ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। বগুড়া চেম্বার অব কমার্স অ্যা- ই-াস্ট্রির সভাপতি মাসুদুর রহমান মিলন বলেন, ‘এ জেলার শ্রমিকদের মজুরী ঢাকা বা চট্টগ্রামের তুলনায় কিছুটা সস্তা। তাছাড়া বগুড়ার উদ্যোক্তারা বরাবরই চ্যালেঞ্জ নিতে জানেন। জেলায় বিরাজমান ব্যবসা বান্ধব পরিবেশকে কাজে লাগিয়ে তারা নতুন নতুন উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে আসছেন। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই শিল্পনগরী হিসেবে পরিচিত বগুড়া তার হারানো সেই গৌরব আবার ফিরে পেতে শুরু করেছে।’

তবে কলকারখানা সম্প্রসারণে বগুড়ার ফাউন্ড্রি লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পেরও বড় একটি ভূমিকা রয়ে গেছে। কারণ কলকারখানায় ব্যবহৃত নানা ধরনের হুইল (চাকা), পিনিয়াম ও ডাইসসহ অনেক ধরনের যন্ত্র বা যন্ত্রাংশ বগুড়ার ফাউন্ড্রি শিল্পে বা লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপে তৈরি হয় এবং সেগুলো খুবই সহজলভ্য। এসব যন্ত্র বা যন্ত্রাংশ নতুন কলকারখানা নির্মাণে বড় ধরনের সহায়ক ভূমিকা পালন করে থাকে। তাছাড়া ১৯৯৮ সালের মাঝামাঝি যমুনা নদীতে ‘বঙ্গবন্ধু সেতু’ উদ্বোধনের পর রাজধানী ঢাকা ও বন্দরনগরী চট্টগ্রামের সঙ্গে বগুড়ার যোগাযোগ সহজ হওয়ার কারণে উৎপাদিত পণ্যের বাজারও সম্প্রসারিত হয়।
বগুড়া আজাদ পাল্প অ্যান্ড পেপার মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘সস্তা শ্রমের পাশাপাশি কারখানা স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় মেশিনের খুচরা যন্ত্রাংশগুলো খুব সহজেই পাওয়া যায়। এখানকার ফাউন্ড্রি শিল্প কিংবা লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং-এ কর্মরত কারিগররা এতটাই দক্ষ যে তাদেরকে প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ একবার দেখালে তারা সেটি হুবহু নিখুঁতভাবে তৈরি করে দিতে পারে। চাহিদা অনুযায়ী কারিগরি এসব সহায়তা সহজে পাওয়া যায় বলেই শিল্প স্থাপনের ক্ষেত্রে উদ্যোক্তারা এ অঞ্চলের জেলাগুলোর মধ্যে বগুড়াকেই এগিয়ে রাখেন। এর পাশাপাশি যমুনা নদীর ওপর সেতু নির্মিত হওয়ার পর এখানকার বাজার আরও সম্প্রসারিত হয়েছে। বগুড়া ভিত্তিক ফাউন্ড্রি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এফওএবি) সহ-সভাপতি আব্দুল মালেক বলেন, ‘ফাউ-্রি শিল্প আমাদের কাছে মাদার ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে পরিচিত। কারণ অন্যান্য শিল্পে ব্যবহৃত প্রয়োজনীয় যন্ত্র বা যন্ত্রাংশের সিংহভাগই বগুড়ার ফাউন্ড্রি শিল্পে তৈরি করা হয়। এর ফলে উদ্যোক্তারা নতুন নতুন শিল্প স্থাপনে আগ্রহী হয়ে উঠছেন।’

গেল শতাব্দীর ষাটের দশকে বগুড়ায় ‘ভাণ্ডারী গ্রুপ’ ও ‘জামিল গ্রুপ’ নামে দুই শীর্ষ শিল্প গ্রুপের অধীনে কটন স্পিনিং মিল, আয়রণ ফ্যাক্টরী, গ্লাস ফ্যাক্টরী, ম্যাচ ফ্যাক্টরী, অয়েল মিল, বিড়ি ফ্যাক্টরী, সোপ ফ্যাক্টরী ও জাহেদ মেটালসহ অর্ধশত কল-কারখানা গড়ে উঠেছিল। তাজমা সিরামিক নামে একটি সিরামিক কারখানাও চালু হয়েছিল। অনেক কারখানায় ২৪ ঘন্টাই (৮ ঘন্টা করে তিনটি শিফট) কাজ হতো। এসব কারখানায় কয়েক হাজার শ্রমিক কাজ করতেন। ব্যক্তি মালিকানায় গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে নানা কারণে একে একে রুগণ্ হতে শুরু করে। আশির দশকের মাঝামাঝি নাগাদ একে একে সবগুলো বন্ধ হয়ে যায়। এতে শত শত শ্রমিক-কর্মচারী বেকার হয়ে পথে বসলেও মালিকরা তাদের বিনিয়োগ করা পুঁজি ফিরিয়ে নিতে বন্ধ কল-কারখানার জায়গাগুলো প্লট বা ফ্ল্যাট নির্মাণ করে বিক্রি করা শুরু করেন। এরই ধারাবাহিকতায় বগুড়া কটন স্পিনিং মিল ও গ্লাস ফ্যাক্টরির জায়গায় গড়ে তোলা হয়েছে ‘ভা-ারী মেগা সিটি’, জাহেদ মেটালকে করা হয়েছে ‘রানার সিটি’, জামিল সোপ ফ্যাক্টরীর জায়গায় গড়ে তোলা হয়ছে ‘জামিল হাউজিং’।
শিল্পগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সেখানে কর্মরত শ্রমিকদের কেউ কেউ ব্যক্তি উদ্যোগে নিজ নিজ বাড়িতে লৌহজাত পণ্য তৈরির ছোট ছোট কারখানা গড়ে তোলেন। যা ফাউন্ড্রি বা ঢালাই কারখানা নামেই পরিচিত। এসব কারখানায় প্রথমে সরিষার তেলের ঘানি তৈরি করা হয়। পরবর্তীতে রান্নার কড়াই, পণ্যের ওজন মাপার বাটখারা, কৃষি কাজে ব্যবহৃত কোদাল এবং মাছ ধরার জালের কাঠিসহ আরও কয়েক ধরনের পণ্যের উৎপাদন শুরু হয়। বগুড়া শহরের সুত্রাপুর এলাকার প্রাচীন ফাউন্ড্রি কারখানা ‘হক মেটালের’ স্বতাধিকারী হুমায়ুন হক জানান, উৎপাদিত এসব পণ্যের চাহিদা বেড়ে গেলে পরবর্তীতে ফাউ-্রি কারখানার সংখ্যাও বাড়তে থাকে। বাড়ে উৎপাদিত পণ্যের পরিমাণও।
আশির দশকের শেষ দিকে সেচ যন্ত্রের ব্যবহার বেড়ে গেলে বগুড়ার ফাউন্ড্রি শিল্পের উদ্যোক্তারা ওই যন্ত্রের সঙ্গে ব্যবহৃত পানি উত্তোলনক ‘সেন্ট্রিফিউগাল পাম্প’ তৈরি শুরু করেন। পরবর্তীতে হস্তচালিত নলকুপও তৈরি করা হয়। এরপর পর্যায়ক্রমে সব ধরনের হুইল (চাকা), পাওয়ার ট্রিলারের (কলের লাঙল) বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রাংশ, লেদ মেশিনের যন্ত্রাংশ, করাত কল (স’মিল), চিড়া তৈরীর কল, অটো রাইস মিলের যন্ত্রাংশ, ফ্লাওয়ার মিলের যন্ত্রাংশ, টেক্সটাইল মিলের যন্ত্রাংশ, মোটরগাড়ীর স্প্রিং, ব্রেক ড্রাম গ্রান্ডিং মেশিন, অয়েল মিল ও জুট মিলের যন্ত্রপাতি তৈরি শুরু হয়। বর্তমানে শহর এবং শহরতলীতে অন্তত বড় ধরনের ৩৯টি ফাউন্ড্রি কারখানা গড়ে উঠেছে। বলা যায় ফাউন্ড্রি শিল্পের হাত ধরেই শিল্পনগরী বগুড়া আবারও যেন তার প্রাণ ফিরে পেতে শুরু করে।
পরবর্তীতে ১৯৯৯ সালে স্থানীয় কয়েকজন উদ্যোক্তা ভারত থেকে জুট মিলের যন্ত্রাংশ এনে বগুড়ায় জুট মিল স্থাপন শুরু করে। তবে ২০০৪ সালে আদমজী জুট মিল বন্ধ হয়ে গেলে তার যন্ত্রাংশ সহজলভ্য হয়ে পড়লে এ জেলায় জুট মিলের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে। এরপর একে একে অটোরাইস মিল, পেপার মিল, রাইস ব্রান অয়েল মিল, অয়েল মিল, অটো ব্রিকস্, ব্যাগ ফ্যাক্টরী ও টাইলস্ কারখানা গড়ে তোলা হয়। শিল্পায়নের সেই ধারা বর্তমানেও অব্যাহত রয়েছে।
বগুড়া চেম্বারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জেলায় মোট ২৪টি জুট মিল, ২৮টি অটোরাইস মিল, ৫টি পেপার মিল, ৩টি অটো ব্রিকস্ কারখানা, ৩০টি কোল্ড স্টোরেজ, ২টি রাইস ব্র্যান অয়েল মিল ও ১টি টাইলস্ কারখানা গড়ে উঠেছে। এছাড়া আরও দু’টি টাইলস্ কারখানা, একটি গ্লাস ফ্যাক্টরী, একটি রাইস ব্র্যান অয়েল মিল এবং চারটি পেপার মিল নির্মানাধীন রয়েছে। বগুড়া ব্যাংকার্স ক্লাবের তথ্য অনুযায়ী বগুড়ায় সরকারি-বেসরকারি মোট ৪৪টি ব্যাংক এবং আরও ১০টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে শিল্প খাতে এ পর্যন্ত প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে। চেম্বার নেতৃবৃন্দের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী বগুড়ায় নির্মিত কল-কারখানায় বছরে নানা ধরনের অন্তত ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার পণ্য উৎপাদিত হয়।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, শিল্পনগরী হিসেবে বগুড়ার এই ঘুড়ে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হলো ষাটের দশকে যেসব শিল্পের কারণে এ জেলাটির আলাদা পরিচিতি গড়ে উঠেছিল বন্ধ হয়ে যাওয়া সেই শিল্পগুলোর কোন কোনটি আবার ফিরতে শুরু করেছে। এরই মধ্যে লৌহজাত অনেক শিল্প অর্থাৎ মেটাল ইন্ডাস্ট্রি গড়ে উঠেছে। ফিরেছে অয়েল মিল, কম্বল ও চাদর তৈরির তাঁত এবং জুটমিল।
বগুড়ায় গড়ে ওঠা ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পগুলোর মধ্যে জেলার আদমদীঘির তাঁত শিল্প এবং শেরপুর ও ধুনট এলাকায় গড়ে ওঠা জালি টুপি (কুরুশ কাঁটা দিয়ে তৈরি) পল্লীর বিস্তৃতি ঘটেছে সবচেয়ে বেশি। আদমদীঘির শাঁওইল গ্রামের ঘরে ঘরে স্থাপন করা ২ হাজার তাঁতে পুরাতন সুতা থেকে বছরে অন্তত ৬০ কোটি টাকার কম্বল ও চাদর তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে টুপি পল্লীতে বছরে অন্তত ১১ কোটি টাকার টুপি তৈরি হচ্ছে। এই শিল্পের উদ্যোক্তা ‘জুয়েল ক্যাপ ডিপো’র স্বত্বাধিকারী জুয়েল আখন্দ জানান, উৎপাদিত এসব টুপির প্রায় ৮০ ভাগই বিদেশে বিক্রি হচ্ছে। ।
বগুড়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মাসুদুর রহমান মিলন জানান, শিল্পখাতে বগুড়া সত্যিকার অর্থেই ঘুরে দাঁড়িয়েছে। এ জেলায় অদক্ষ শ্রমিকদের বড় একটি অংশ এখন নিজেদেরকে দক্ষ করে গড়ে তুলেছেন। দক্ষ শ্রমিকদের কারণেই জেলার বাইরে থেকেও অনেক উদ্যোক্তা এখন বগুড়ার দিকে আসতে শুরু করেছেন। তিনি বলেন, ‘বগুড়ায় কলকারখানায় উৎপাদিত অনেক পণ্য এখন বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। পণ্যগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: পাটজাত পণ্য, রাইস ব্র্যান অয়েল এবং জমি সেচ কাজে ব্যবহৃত পানির পাম্প। গেল বছরে বগুড়া থেকে প্রায় ৩০ কোটি টাকার পণ্য রপ্তানি হয়েছে। ভবিষ্যতে এ রপ্তানী আরও কয়েকগুন বাড়বে।’